Bengali Forex Course

কোর্সের বিষয়বস্তু

১ম অংশ: ফরেক্স সম্পর্কে মৌলিক ধারনা

ফরেক্স সম্পর্কে মৌলিক ধারনা:

বিনামূল্যে প্রদত্ত এই ফরেক্স প্রশিক্ষণ কোর্সটি আপনাকে ফরেক্স সম্পর্কে মৌলিক ও স্বচ্ছ  ধারনা দিবে খুবই সহজ ভাবে। এটি অত্যন্ত দ্রুত ও উপযোগী পথ-নির্দেশিকা হিসেবে আপনাকে সাহায্য করবে একজন সফল ফরেক্স ব্যবসায়ী (Forex Trader) হয়ে উঠতে। ফরেক্স সম্পর্কে অনেক ব্যক্তি,প্রতিষ্ঠান এবং ইন্টারনেট এর ওয়েব সাইট গুলো হয়ত অনেক কিছু বলতে পারবে,কিন্তু সেগুলো কখনই সাধারণ মানুষের বোধগম্য হয়না। কারণ সেগুলো বিচ্ছিন্ন, ভ্রান্ত, অসম্পূর্ণ, দুর্বোধ্য এবং খুবই বিরক্তিকর হয়ে থাকে। আমাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা থাকবে আপনাকে অত্যন্ত পরিষ্কার এবং দ্রুততম উপায়ে ফরেক্স এর মৌলিক শিক্ষা দান করা, যা হবে মজার ও আনন্দদায়ক।

এই কোর্সটি থেকে আপনি খুব সহজেই শিখে নিতে পারবেন-

ফরেক্স কি?

ফরেক্স ট্রেড(Forex trade) কি?

কিভাবে সফলভাবে ফরেক্স থেকে আয় করা যায়?

এরপর আপনি স্বচ্ছ এবং সঠিক এই জ্ঞান ব্যবহার করে একজন প্রকৃত এবং সফল ফরেক্স ট্রেডার হিসেবে নিজেকে আত্মপ্রকাশ করতে পারবেন।

চলুন এবার শুরু করা যাক:

ফরেক্স বাজার(Forex Market) কি?

ফরেক্স সম্পর্কে মৌলিক ধারনা:

মূলত, ফরেক্স বাজার(forex Market) হল সেই যায়গা যেখানে সবাই বিভিন্ন দেশের মুদ্রা কেনাবেচা এবং মূল্য নির্ধারণ করে। সবাই বলতে এখানে বিভিন্ন ব্যাংক, ব্যবসায়ী, প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগকারী, ক্রেতা-বিক্রেতা, এমনকি সরকারকেও বোঝানো হয়েছে। একে মুদ্রা বাজার(Currency market), বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় কেন্দ্র(Foreign currency exchange center), বৈদেশিক মুদ্রার বাজারও(Foreign currency market) বলা হয়ে থাকে। তবে যে নামেই ডাকা হোক না কেন, এটি হল বিশের সবচেয়ে বড় এবং তরল বাজার। এইখানে প্রতিদিন প্রায় চল্লিশ লক্ষ কোটি ডলার এর সমপরিমাণ লেনদেন হয়। এটি একটি মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয় এর ব্যবসা তাই খুব সহজেই অর্থ আয় ও রূপান্তর করা যায়।

এই বাজার প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টাই খোলা থাকে এবং সপ্তাহে ৫ দিন কেনাবেচা চলে। সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী বিনিময় কেন্দ্র গুলো লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, জুরিখ, হংকং, ফ্রাঙ্কফুর্ট, টকিয়ো, সিঙ্গাপুর, প্যারিস ও সিডনিতে অবস্থিত। এটা অবশ্যই লক্ষণীয় যে ফরেক্স বাজার বলতে কখনই কোন একক বা কেন্দ্রীয় বাজার বা জায়গা কে বোঝানো হয়না। এটি নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ এর মতো কোন কেন্দ্রীয় শেয়ার বাজার না যেখানে এক যায়গায় সকল লেনদেন ও অন্যান্য কাজ করা হয়ে থাকে।ফরেক্স বা বৈদেশিক মুদ্রার মূলত বিভিন্ন ব্যাংকগুলোতে কেনাবেচা হয় এবং এখানেই এর নির্দিষ্ট ও সঠিক মূল্যনির্ধারণ করা হয়ে থাকে ।এবং বিভিন্ন ব্রোকার(Broker) বা দালালী(Dealer) প্রতিষ্ঠান গুলো এসব ব্যাংক থকে তথ্য নিয়ে আমাদেরকে এসবের একটি তুলনামূলক গড় মূল্য জানিয়ে থাকে। এই ব্রোকার প্রতিষ্ঠানগুলি মূলত ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের জন্য ফরেক্স এর বাজার তৈরি করে এবং লেনদেন এর ব্যবস্থা করে।  যখন আপনি কোন currency pair কিনবেন তখন এই ব্রোকারই তা আপনাকে বিক্রয় করবে। এর জন্য আরেকজন বিক্রেতার কোনও প্রয়োজন হবেনা।

ফরেক্স এর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস:

এই অংশটুকু অনেকেরই বিরক্তিকর হবে কিন্তু এই কথাগুলোও আপনার জন্য উপকারী হবে। ফরেক্স কি এবং কেন এটি তৈরি হয়েছিল তা জানার জন্য এর ইতিহাস তো জানতেই হবে। এখন সংক্ষিপ্তভাবে এর ইতিহাস বর্ণনা করা হল।

১৮৭৬ সালে স্বর্ণ ভিত্তিক মুদ্রা ব্যবস্থা( gold exchange standard) চালু করা হয়েছিল।এই ব্যবস্থায় মুদ্রার মূল্যমান স্বর্ণের মানের উপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয়। ফলে মোট স্বর্ণের মূল্যর সমপরিমাণ কাগুজে মুদ্রা কোন দেশের জন্য রাখা হত। এই পদ্ধতি বেশ ভালই ছিল। কিন্তু স্বর্ণ এর আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে এই পদ্ধতির ত্রুটি ধরা পরে এবং একে বিদায় নিতে হয়।

এই স্বর্ণ ভিত্তিক মুদ্রা ব্যবস্থা বাতিল করা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর সময় যখন ইউরোপীয় দেশগুলোতে তাদের বিশাল সব প্রকল্পগুলোকে বাস্তবায়িত করার মতো টাকা ছিলোনা। কারণ তাদের স্বর্ণের মজুদ ঐ পরিমাণ টাকা ছাপার জন্য খুবই অপ্রতুল ছিল। যদিও এই স্বর্ণ ব্যবস্থা বাতিল হয়ে গেছে, তবুও স্বর্ণ তার মূল্য এবং মুদ্রামানে নিজের অবস্থান ভালভাবেই ধরে রেখেছে।

পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত হয় যে, সকল মুদ্রার মান নির্দিষ্ট হবে এবং আমেরিকান ডলার হবে মুদ্রার জন্য নির্ধারিত সংরক্ষিত ভিত্তি যা স্বর্ণ এর বিপরীতে একমাত্র পরিমাপকৃত মুদ্রা। এই ব্যবস্থাকে বলা হয় ব্রেটন উডস ব্যবস্থা ( Bretton Woods System) যা ১৯৪৪ সালে কার্যকর হয়। ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দেয় যে তারা আর স্বর্ণের বিপরীতে ডলার এর বিনিময় এ আগ্রহী নয় যা বৈদেশিক সংরক্ষণ হিসেবে রাখা আছে। এর ফলে ব্রেটন উডস ব্যবস্থাও বাতিল হয়ে যায়।

১৯৭৬ সালে এই ব্যবস্থা অকার্যকর হয় যার মাধ্যমে মূলত সর্বসম্মতভাবে পরিবর্তনশীল মুদ্রা ব্যবস্থার প্রচলন হয়েছিল। এর মাধ্যমেই আধুনিক বৈদেশিক মুদ্রার বাজারের প্রবর্তন হয় যা ১৯৯০ সালের দিকে বর্তমান যান্ত্রিক ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার রূপ নেয়।

এখন কিছু আকর্ষণীয় ও কাজের কথায় আসা যাক।

ফরেক্স বাণিজ্য(Forex trading) কি?

এটি মূলত আমার আপনার মতো খুচরা ব্যবসায়ীদের সাথে জড়িত একটি ব্যবস্থা যা একটি মুদ্রার বিপরীতে অন্য একটি মুদ্রার তুলনামূলক মূল্য নির্ধারণ করে। ধরা যাক, আপনি অনুমান করছেন যে ইউরো এর মূল্য আমেরিকান ডলার এর বিপরীতে বৃদ্ধি পাবে এবং সেজন্য আপনি কম মূল্য এর ইউরো-ইউএসডি জোড় কিনলেন যা আপনি ইউরো এর মূল্য ইউএসডি এর বিপরীতে বৃদ্ধি পেলে বেচে দিয়ে লাভ করবেন। কিন্তু, কোনোভাবে যদি উল্টো আমেরিকান ডলার এর মূল্য বৃদ্ধি পায় তবে আপনাকে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। ফলে, ফরেক্স এ জড়িত বিনিয়োগকারীদের অবশ্যই এর ঝুঁকির ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে, শুধু লাভ এর কথা ভাবলে চলবেনা।

কেন ফরেক্স সারা বিশ্বে এত জনপ্রিয়?

ফরেক্স ব্যবসায়ীদের বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ও সম্ভবনাময়ী পেশাজীবীদের মধ্যে অন্যতম। এটা সবার জন্য সত্যি না হলেও আপনি দৃঢ় সংকল্প ও অধ্যবসায় এর মাধ্যমে সাফল্যের চূড়ায় উঠতে পারেন। এখানে ফরেক্স এ সাফল্য লাভের জন্য যেসকল গুণ একজনের মধ্যে থাকতে হয় তা উল্লেখ করা হল:

ক্ষমতা-নিরাবেগ ভাবে ক্ষতি স্বীকার করার।

আত্মবিশ্বাস-নিজের এবং নিজের কৌশল এর উপর বিশ্বাস রাখার এবং নির্ভীক থাকার।

উৎসর্গ-সেরা বিনিয়োগকারী হওয়ার জন্য মন-প্রাণ কে  উৎসর্গ করতে হবে।

আত্মসংযম-প্রলোভন ও উত্তেজনার এই জায়গায় নিজেকে নিরাবেগ রাখতে।

নমনীয়তা:সর্বদা পরিবর্তনশীল এই বাজারে সবসময় মানিয়ে নেয়ার জন্য।

সংহত:নিজের কৌশল ও পরিকল্পনাতে নিজেকে সর্বদা ধরে রাখতে যেন কখন পথভ্রষ্ট না হয়।

সুসংগঠিত:সঠিক ও ইতিবাচক বিনিয়োগ অভ্যাস এর জন্য নিজেকে দৃঢ়ভাবে চালনা করার জন্য।

যুক্তিবাদিতাঃফরেক্স কে সঠিক এবং বাস্তবিক চোখ দিয়ে দেখার জন্য।

ধৈর্য:পরিকল্পনা মাফিক চলার জন্য এবং সর্বোচ্চ সম্ভবনাময়ী ও লাভজনক কৌশল এর বাস্তবায়ন এর অপেক্ষার জন্য।

বাস্তববাদী:ফরেক্স, প্রকৃত অবস্থা এবং সহজে ও দ্রুত ধনী হওয়া যায়না তা বোঝার জন্য।

জ্ঞান:যে কোন পরিবর্তন ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে সাফল্য অর্জন করার জন্য।

আত্মনিয়ন্ত্রণ:প্রয়োজন ও উচিতের বাইরে অধিক লাভের আশায় যেন সব ধ্বংস না হয়ে যায়।

ফরেক্স বাজার এর উচ্চ পরিবর্তনশীলতা( volatility), লব্ধতা(Leverage) ও চাঞ্চল্য কে কাজে লাগিয়ে সাফল্য ও মুনাফা লাভ করতে পারে যে কেউ। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন কার্যকর কৌশল যা আপনাকে রপ্ত  করতে হবে এবং তা প্রয়োগ করতে হবে লাভ-দায়ক ও সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে।এর জন্য অত্যন্ত ধৈর্য ও সংযম দরকার। ফরেক্স এর মূল চাবিকাঠি হল অর্থ ব্যবস্থাপনা(Money Management)। ঋণ ও লব্ধ ব্যবসায় পদ্ধতি আপনাকে খুব দ্রুত মুনাফা দিতে পারে কিন্তু তা আবার নিমেষে সব শেষও করে দিতে পারে। অর্থ ব্যবস্থাপনা এর মূলমন্ত্র হল কি পরিমাণ অর্থ যে কোন বিনিয়োগের ফলে হারাতে পারে তা সঠিক ভাবে হিসাব করতে পারা এবং তা নিশ্চিন্ত মনে মেনে নেয়া। যে কেউ ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে, এতে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। অর্থ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আমরা পরবর্তীতে বিস্তারিত আলোচনা করব।

কারা ফরেক্স করে এবং কেন করে?

ব্যাংক:বেশীরভাগ বৈদেশিক মুদ্রার কেনাবেচা হয় আন্তঃ-ব্যাংক মুদ্রা বাজার এর মাধ্যমে যারা প্রচুর পরিমাণ মুদ্রার বেচাকেনা করে প্রতিদিন। বড় ব্যাংকগুলো প্রতিদিন কয়েক শত কোটি টাকার লেনদেন করে। কখনও এই কেনাবেচা হয় ব্যাংক এর মক্কেলদের জন্য কিন্তু বেশিরভাগ হয় ব্যাংকগুলোর মালিক-পক্ষের দ্বারা যারা ব্যাংক মাধ্যমে ফরেক্স এর কেনাবেচা করেন।

অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান:বৈদেশিক মুদ্রার বাজার এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন দেশে তাদের পণ্য ও সেবা  আদান-প্রদান করার জন্য থেকে অর্থ লেনদেন করে। ফরেক্স এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বড় অঙ্কের লেনদেন হয়ে থাকে এইসব প্রতিষ্ঠান এর বিভিন্ন দেশে ব্যবসায়ী দেনা-পাওনা মিটানোর মাধ্যমে।

সরকার/কেন্দ্রীয়ব্যাংক:বৈদেশিক মুদ্রা এর লেনদেন ও মূল্য নির্ধারণে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনেক প্রভাবশালী ভূমিকা রাখে। কোন দেশের মুদ্রার মূল্য সে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হ্রাস-বৃদ্ধি করতে পারে তাদের অর্থের যোগান নিয়ন্ত্রণ, সুদের হার নির্ধারণ ও মুদ্রাস্ফীতি নিতির বাস্তবায়ন এর মাধ্যমে।

সংরক্ষিত তহবিল( Hedge funds): প্রায় ৭০-৮০ ভাগ বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন হয় এর মূল্য পরিবর্তন এর মাধ্যমে কেনাবেচা করে লাভের আশায়। অর্থাৎ, যে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন করলে তা আসলে সেগুলো হাতে নেয়ার জন্য নয় বরং তা করা হয় শুধুই মুদ্রার মূল্য হ্রাস-বৃদ্ধির মাধ্যমে মুনাফা লাভের আশায়। আমরা যারা খুচরা বা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী আছি, তাদের লেনদেনর পরিমাণ ঐ বিশাল তহবিল এবং তার শত শত কোটি ডলার এর দৈনিক লেনদেন এর সামনে যেন সমুদ্রের সামনে এক গ্লাস পানি। এই বিশাল লেনদেন ও তহবিল-ই বিভিন্ন মুদ্রার মান পরিবর্তন ও নির্ধারণ করতে পারে।

ব্যক্তিঃ আমরা যখন অন্য কোন দেশে ভ্রমণ বা কাজে যাই অথবা অন্য দেশ থেকে টাকা পায় বা দেই (আত্মীয়র কাছে বা কাজের বা পণ্যের মূল্য হিসেবে) এবং সেই অর্থ ব্যাংক বা অন্য কথাও প্রয়োজনীয় মুদ্রায় ভাঙিয়ে নেই তখন সেটিও একটি বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনের মধ্যে পড়ে।

বিনিয়োগকারী:বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যারা তাদের মক্কেলদের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচার ব্যবস্থা করে এবং তাদের বিনিয়োগ ও হিসাব নিয়ন্ত্রণ ও রক্ষা করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যেসকল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যারা আন্তর্জাতিকভাবে বিনিয়োগ হিসাব নিয়ন্ত্রণ করে, তারা কিন্তু এই সকল প্রকার মুদ্রা-জোড় এর কেনাবেচার জন্য ফরেক্স বাজারকেই ব্যাবহার করে।

খুচরাফরেক্সব্যবসায়ীঃসবশেষে আছে আমার আপনার মতো ফরেক্স ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীগণ।ফরেক্স এ এই প্রকার অংশগ্রহণের হার দিন দিন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। এর মূল কারণ হল ফরেক্স এর নানাবিধ ব্যবস্থা, সুযোগসুবিধা ও ইন্টারনেট এর সহজলভ্যতা। এখন আমরা সহজেই কোন ব্যাংক বা ব্রোকারের মাধ্যমে লেনদেন করতে পারি। বর্তমানে ২ প্রকার খুচরা ব্রোকার দেখা যায় যারা ফরেক্স এর দামদর জানতে ও লেনদেন করতে আমাদের সাহায্য করে থাকে- ১।ব্রোকার(Broker) ২। ডিলার(Dealer) ব্রোকারগণ বিনিয়োগকারীদের প্রতিনিধি হিসেবে ফরেক্স এর বাজারে কেনাবেচা করে থাকে, তাদের বিশ্লেষণে সবচেয়ে লাভ-দায়ক ও সম্ভাবনাময় যায়গাগুলোতে।প্রতি কেনাবেচার জন্য তারা নির্দিষ্ট হারে মাশুল বুঝে নেয়। ডিলার দের ভূমিকা এক্ষেত্রে উল্টো। এরা বাজারের মূল্য নির্ধারণকারী(Market Maker) বলে পরিচিত। এরা নিজেরাই ব্যবসায়ীদের সাথে দর কষাকষি ও কেনাবেচা করে থাকে। তাদের উদ্ধৃত মূল্য অনুযায়ী তাদের সাথে আমরা কেনাবেচা করে থাকি। এই ক্রয় ও বিক্রয়মূল্য এর মধ্যে যে পার্থক্য থাকে তা হল তাদের অংশ যা ব্যাপ্তি বা Spread নামে পরিচিত। এ বিষয়ে পরবর্তীতে আরও আলোচনা করব।

ফরেক্স এর সুযোগ-সুবিধাঃ

১। ফরেক্স হল বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাজার যার দৈনিক লেনদেন এর পরিমাণ গড়ে প্রায় ৪০ লক্ষ কোটি ডলার। এর তারল্য এতই বেশী যে এখানে নিমেষেই লেনদেন ও কেনাবেচা সম্পন্ন করা যায়।

২। যখন খুশি তখন কাজঃ এখানে সময়ের কোন বাধ্যবাধকতা নেই। রবিবার বিকাল৫ টা হতে শুক্রবার বিকাল ৫টা পর্যন্ত যখন যা খুশি লেনদেন করতে পারবেন।

৩। সহজে ও মুহূর্তেই বাজারে প্রবেশ ও লেনদেনঃ যে কেউ চাইলেই মুহূর্তের মধ্যেই মাত্র ১০ ডলারেও চাইলে খুচরা ব্রোকার এর কাছে হিসাব খুলে কেনাবেচা শুরু করতে পারবে। এর জন্য চাই শুধু ইন্টারনেট ও কিছু মাউসের ক্লিক।

৪। অল্প কিছু মুদ্রা জোড় ও কৌশল এ চোখ রাখলেই যথেষ্ট। পুরো বাজারের অসীম জটিলতা মাথায় কেন নিবেন?

৫। ফরেক্স এর জন্য চলমান ইন্টারনেট থাকেলেই যেকোনো স্থানে ল্যাপটপ, মোবাইল বা পিসি থেকে আপনি ফরেক্স এ মূল্য, বিশ্লেষণ, খবর দেখতে ও ইচ্ছামত লেনদেন করতে পারবেন।

৬। শেয়ার বাজারের তুলনায় এর মাশুল ও লেনদেন সহ অন্যান্য খরচ প্রায় অতি নগণ্য।

৭। ফরেক্স অতিমাত্রায় পরিবর্তনশীল ও মুনাফা অর্জনের জন্য অতি সম্ভাবনাময়। মুদ্রার দর যত পরিবর্তন হবে ততই মুনাফা অর্জন করা যাবে।

সবচেয়ে মজার ও আকর্ষণীয় তথ্য এই যে ফরেক্স কখনই শেয়ার বাজারের মতো এক-পাক্ষিক নয়।এখানে দাম বাড়লে যেমনভাবে মুনাফা অর্জন করা যায়, একই ভাবে দাম কমলেও মুনাফা অর্জন করা যায়। ফরেক্স বিনিয়োগ ও মুনাফা অর্জনের এক অসাধারণ যায়গা, তবুও আপনাকে সর্বদা ঝুঁকি ও মুনাফার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক ও সম্ভাবনার কথা মাথায় রাখতে হবে। অনেকই এখানে দ্রুত অনেক লাভ করতে আসে এবং বোকামি করে ফলস্বরূপ খালি হাতে ফেরে। এখানে দীর্ঘ মেয়াদীভাবে মুনাফা অর্জন করে টিকে থাকতে চাইলে সঠিক কৌশল জানতে ও প্রয়োগ করতে হবে এবং যে কোন মুহূর্তে ক্ষতি হওয়াটাকে মেনে নিতে হবে হাসিমুখে।

২য় অংশ: ফরেক্স এর পরিভাষা (Forex terminology)

ফরেক্স এর নিজস্ব একটি পরিভাষা ও শব্দ-সমাহার আছে। ফলে, ফরেক্স এর অনন্যা বিষয় শেখার আগে আপনাকে অবশ্যই এর পরিভাষা ও শব্দ-সমাহার সম্পর্কে জানতে ও মনে রাখতে হবে।

ফরেক্স এর নিজস্ব পরিভাষার প্রাথমিক শব্দ-সমাহার:

ক্রস রেট(Cross rate):

২টি বৈদেশিক মুদ্রার পারস্পারিক বিনিময় মূল্য।সহজভাবে, এটি হল যে কোন একটি দেশের মুদ্রার তুলনায় অন্য আরেকটি দেশের মুদ্রার মূল্য-হার। একে currency quote ও বলা হয়। এই হার শুধুমাত্র উল্লেখিত ঐ ২টি মুদ্রার মধ্যকার পারস্পারিক মূল্য-হার। এর সাথে অন্য কোন দেশের মুদ্রার কোন রকমের সম্পর্ক নেই।

উদাহরণস্বরূপ, আপনি যখন বাংলাদেশের পত্রিকায় বা টিভি তে EUR ও USD এর ক্রস রেট দেখছেন, তখন তা শুধু তাদের নিজেদের মূল্যর তুলনামূলক হার যার সাথে বাংলাদেশের টাকার কোনই সম্পর্ক নেই।

বিনিময় হার(Exchange rate):

একটি মুদ্রার বিপরীতে অন্য একটি মুদ্রার দাম। যেমন, EUR/USD= ১.৩২৩২ বলতে বোঝায় যে ১ EUR সমান ১.৩২৩২ USD।

পিপস(Pips):

যেকোনো মুদ্রার মূল্য পরিবর্তন এর ক্ষুদ্রতম একক। একে পয়েন্ট ও বলা হয়। যেমন,  EUR/USD এর ক্ষেত্রে ১ পিপ হল ০.০০০১ এবং USD/JPY এর জন্য তা ০.০১।

লেভারেজ(Leverage):

আপনার প্রকৃত মূলধনকে কয়েক গুণ বৃদ্ধি করার কৌশল কে বলা হয় Leverage। আপনার লেনদেন এর সীমা যদি হয় ১০০ ডলার এবং আপনি ১০:১ Leverage করেন তবে আপনার বিনিয়োগের জন্য ১০০০ ডলার হল। আবার আপনার যদি প্রকৃত মূলধন বা লেনদেন এর সীমা ১০০০ ডলার হয় এবং আপনি ১০০:১ Leverage করেন তবে আপনি ১০০০০০ ডলার এর সমপরিমাণ কেনাবেচা করতে পারবেন।

এখন কিভাবে বুঝবেন আপনার Leverage কত? মনে করুন আপনার লেনদেন এর বর্তমান সীমা হল ১০০০০ ডলার যা দিয়ে আপনি এক লট USD/JPY Currency Pair  কিনলেন যার দাম পরল ১০০০০০ ডলার। এখানে আপনি যে দাম দিয়ে প্রাথমিক ক্রয় এর কাজটি করেছেন তাকে আপনার বর্তমান সীমা এর পরিমাণ দিয়ে ভাগ করলেই আপনার Leverage কত তা জানতে পারছেন যা এখানে ১০:১। অথবা একই সীমাতে আপনি এক লট EUR/USD Currency Pair  কিনলেন যার দাম পরল ১৫০০০০ ডলার, ধরুন EUR/USD=১.৫০০০।আপনার Leverageএখানে ১৫:১।

নিচের চার্ট এর উদাহরণ গুলো দেখুন আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে

Leverage

আপনার বিনিয়োগ $

সর্বমোট $

১:১

১০০

১০০

১:১০০

১০০

১০,০০০

১:২০০

১০০

২০,০০০

১:৫০০

১০০

৫০,০০০

১:১০০০

১০০

১,০০,০০০

পরিমাণ/প্রান্ত(Margin):

যে কোন অবস্থানের বা কাজের জন্য আপনার মূলধন এর প্রান্তীয় পরিমাপ থাকে। এটি ২ ধরনের হয়ে থাকে যথা- ব্যবহারযোগ্য ও ব্যবহৃত ,Free and Used Margin । Used Margin হল আপনার আপনার লেনদেন করার ফলে মূলধনের যে অংশটুকু বর্তমানে খাটানো আছে। এবং ব্যবহারযোগ্য Free Margin হল এই অবস্থায় যে পরিমাণ মূলধন বিনিয়োগ এর জন্য অবশিষ্ট আছে। আপনার যদি ১০ ডলার থাকে এবং ১০০:১ Levarage থাকে তবে আপনার Margin হল ঐ ১০ ডলার পর্যন্ত। আপনি ঐ পরিমাণ অর্থের সমপরিমাণ যেকোনো Currency Pair  কেনাবেচা করতে পারবেন যতক্ষণ না পর্যন্ত আপনার অব্যবহৃত অর্থ এবং লেনদেন-কৃত মোট মুদ্রামান এর যোগফল ১০ ডলার এর কম না হয়ে যায় অর্থাৎ আপনার গ্রহণযোগ্য Margin ১%। কেউ লেনদেন শুরু বা শেষ অথবা চালু রাখার সময় যদি মূল্য পরিবর্তন বা অন্য কারণে তার লেনদেন-কৃত মুদ্রা ও মূলধনের মোট মূল্যমান যদি তার ব্যবহারযোগ্য সীমা এর নীচে চলে যায় তবে ব্রোকার তাকে একটি “Margin call” বা সতর্ক সঙ্কেত দেয় যা তাকে কোন লেনদেন বন্ধ বা আরও অর্থ ঐ হিসাবে বিনিয়োগে বাধ্য করে। সাধারণত, ব্রোকাররাই উক্ত অবস্থায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা যেমন কোন লেনদেন বন্ধ করা বা অনুরূপ কিছু করে থাকে।

Spread :

কোন Currency Pair  এর জন্য প্রস্তাবিত এবং গৃহীত মূল্য এর পার্থক্য কে তার ব্যাপ্তি বা Spread বলে। একে ক্রয়মূল্য ও বিক্রয়মূল্য এর পার্থক্যও বলা জেতে পারে। এটি হচ্ছে ব্রোকারের মুনাফা যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ৩পিপস হয়ে থাকে। ধরুন,  এর বিক্রয়মূল্য= ১.৩২৩০ এবং ক্রয়মূল্য ১.৩২৩৩।অর্থাৎ এর স্প্রেড হল ৩পিপস। এখন আপনি যদি এই দরে EUR/USD ক্রয় করেন তবে আপনাকে অন্তত ৩ পিপস বৃদ্ধির জন্য অপেক্ষা করতে হবে নাহলে আপনি ব্যাপ্তির জন্য ঐ ৩ পিপস এর সমপরিমাণ অর্থ হারাবেন।

সবচেয়ে পরিচিত ও বড় মাপের Currency Pair  এর সংক্ষিপ্ত তালিকা:

এবার বুঝব ফরেক্স এর Currency Pair  গুলোর মূল্য কিভাবে উদ্ধৃত(Quote) করা হয়:

ট্রেডিং করার পূর্বেই আমাদের বুঝতে হবে ফরেক্সের Currency Pair  গুলর মূল্য কিভাবে লেখা হয়।

প্রথমেই লক্ষণীয় যে, এখানে মুদ্রার কেনাবেচা করা হয় জোড় হিসাবে যেমন EUR/USD, USD/JPY ইত্যাদি। এর কারণ হল, আমরা যখন লেনদেন করি তখন আসলে একটি মুদ্রা কিনি এবং আরেকটি মুদ্রা বিক্রয় করি। এখন আমি যদি EUR/USD ক্রয় করি এবং এরপর EUR এর মূল্য USD এর বিপরীতে বৃদ্ধি পায় তবে আমি লাভবান হব।

জোড়ার প্রথমটিকে বলা হয় মূল(Base) এবং পরেরটিকে বলে উদ্ধৃত(Quote/ counter) মুদ্রা এবং এদের মাঝে একটি “/” চিহ্ন ব্যবহার করা হয়।

এখন আমি যদি EUR/USD ক্রয় করতে চাই তবে তাদের বিনিময় হার আমাকে বলবে যে আমাকে কত USD(Quote) দিয়ে এক EUR(Base) কিনতে হবে। EUR/USD= ১.৩২৩২১ হলে বুঝতে হবে ১ EUR(Base)কিনতে ১.৩২৩২১ USD(Quote)  দিতে হবে।

আবার, আমি যদি EUR/USD বিক্রয় করতে চাই তবে তাদের বিনিময় হার আমাকে বলবে যে আমাকে কত USD(Quote) পাওয়া যাবে এক EUR(Base) বিক্রয় করলে। EUR/USD= ১.৩২৩২১ হলে বুঝতে হবে ১ EUR(Base) বিক্রয় করলে ১.৩২৩২১ USD(Quote)  পাওয়া যাবে।

আরও সহজভাবে বলি, Base মুদ্রা হল লেনদেন এর ভিত্তি যা আসলে লেনদেন করা হয়। আমরা কোন Currency Pair  কিনলে আসলে তার Base মুদ্রা কিনি তার জোড়ার বিপরীত মুদ্রা দিয়ে এবং কোন Currency Pair  বিক্রি আসলে তার Base মুদ্রা বিক্রি করে তার জোড়ার বিপরীত মুদ্রা কিনি।যেমন, EUR/USD কিনলে আসলে EUR কিনি USD দিয়ে এবং EUR/USD বিক্রি করলে আসলে তার EUR বিক্রি করে USD পায়। ফলে, যায় করি না কেন তা আসলে Base মুদ্রাটিকে নিয়েই করা হয়।

সাধারণভাবেই, ফরেক্স এর খুব প্রাথমিক কথা হল যে, আপনি যদি মনে করেন Base মুদ্রাটির মূল্য তার উদ্ধৃত বা বিপরীত মুদ্রাটির তুলনায় বাড়বে তবে আপনি ঐ Currency Pair টি কিনবেন এবং যদি মনে করেন প্রথম মুদ্রাটির দাম পরেরটির তুলনায় কমবে তাহলে জোড়টি বিক্রি করে দিতে পারেন।

BID and ASK Price

BID Price: 

Bid price হল যে দামে ব্রোকার আপনার কাছে থেকে কোন Currency Pair কিনে নেবে। অর্থাৎ, যে দামে আপনি কোন Currency Pair বিক্রয় করবেন তা হল Bid price।

Ask Price:

Ask price হল যে দামে ব্রোকার আপনাকে কোন Currency Pair বিক্রি করে। অর্থাৎ, যে দামে আপনি কোন Currency Pair ক্রয় করবেন তা হল Ask price।

Bid/Ask Spread:

কোন Currency Pair এর Bid price এবং Ask price এর মধ্যে যে পার্থক্য থাকে তাকে BID Spread ও Ask Spread বলেএটি মুদ্রা, ব্রোকার এবং পরিস্থিতিভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়।

৩য় অংশ: লেনদেন এর প্রকার, লাভ-লোকসান এর হিসাব

কেনা(Buy) এবং বেচা(Sell): ফরেক্স এর বাজারে ট্রেড করার প্রথম কথা হল কম দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করা অথবা বেশি দামে বিক্রি করে কম দামে কিনে নেয়া। প্রথম অংশটুকু ঠিকমতো বুঝলেও শেষের অংশটুকু হয়ত আপনার মাথায় ঢুকেনি। হয়ত ভাবছেন, আগে বিক্রি করে কোন কিছু পরে কেমন করা কেনা যায়। এমন উল্টো ঘটনা আর কোথাও শুনেননি। এখন শুনে নেন। ফরেক্স এ যখন বিক্রি করার কথা বলা হয় তখন আসলে Currency Pair এর প্রথম(Base) মুদ্রা এর বিনিময়ে উদ্ধৃত(Quote) মুদ্রা কেনার কথা বলা হয়। অন্যান্য বাজার ব্যবস্থা এর সাথে ফরেক্স এর এটা একটা অনন্য পার্থক্য এবং বৈশিষ্ট্য। এটা একটু আজব মনে হবে কিন্তু ফরেক্স এ কোন লেনদেন করার জন্য আপনার ব্রোকার আপনাকে প্রয়োজনীয় পণ্য বা মুদ্রা ধার হিসেবে দেয় যা আপনার লেনদেন শেষ করার পর তাকে আপনি ফেরত দিবেন। যেহেতু এখানে বস্তুগত বা হাতে-হাতে কোন লেনদেন করতে হচ্ছেনা, সেহেতু যান্ত্রিক ব্যবস্থায় করা এই কাজে সময় বা পণ্য নিয়ে কোন সমস্যা নেই।

দীর্ঘ(Long) ও স্বল্প(Short):

ফরেক্স এর অভূতপূর্ব বৈশিষ্ট্য হল যে এখানে বাজার উঠলে যেমন লাভ করা যায়, বাজার নামাতেও একইভাবে লাভ হয়। এই বাজার শেয়ার বাজার এর মতো এক-পাক্ষিক নয়। যারা ফরেক্স করে তারা এটা ভালভাবেই জানে যে সবচেয়ে ভাল লাভ হয় বাজার নেমে গেলে। তাই আপনি যদি বাজারের উঠানামা এর দ্বৈত নীতি (Bull and Bear) বুঝে ট্রেড করতে পারেন তবে আপনার মুনাফা করার অসংখ্য সুযোগ আছে এখানে।

দীর্ঘ(Long): এটা আসলে বোঝায় যে আপনি বাজারে কোন মুদ্রা কিনেছেন যেন বাজার উঠলে তা বেশি দামে বিক্রি করে মুনাফা অর্জন করতে পারেন। এইখানে প্রথম(base) মুদ্রাকে দ্বিতীয়(quote) মুদ্রার বিনিময়ে কেনা হয়। যেমন, আপনি EUR/USD কিনেছেন মানে হল আপনি USD দিয়ে ইউরো কিনেছেন যেন USD এর বিপরীতে ইউরো এর দাম বৃদ্ধি পেলে তা আপনি আবার USD দিয়ে বিক্রি করবেন এবং মুনাফা অর্জন করবেন।

স্বল্প(Short):  এটা আসলে বোঝায় যে আপনি বাজারে কোন মুদ্রা বিক্রি করেছেন যেন বাজার নামলে তা বেশি কম দামে কিনে মুনাফা অর্জন করতে পারেন। এইখানে দ্বিতীয়(quote) মুদ্রাকে প্রথম(base) মুদ্রার বিনিময়ে কেনা হয়। যেমন, আপনি EUR/USD বিক্রি করেছেন  মানে হল আপনি ইউরো দিয়ে  USD কিনেছেন যেন USD এর বিপরীতে ইউরো এর দাম কমলে তা আপনি আবার USD দিয়ে কিনবেন এবং মুনাফা অর্জন করবেন।

লেনদেন এর অর্ডার (Order) এবং তার প্রকারভেদ:

ফরেক্স এ যখন আমরা কোন লেনদেন বা ট্রেড করি তখন তাদেরকে একেকটি অর্ডার (Order) বলে। এইসব লেনদেন এর অর্ডার(Order) অনেক প্রকার এর হয়ে থাকে যার মধ্যে কিছু কছু খুবই সাধারণ এবং কয়েকটি বিশেষ অর্ডার(Order)। ব্রোকার ভেদে অর্ডার সার্ভিস কম বেশি হয়ে থাকে।

আমরা আপনাকে সবগুলো সম্পর্কেই ধারনা দেব:

Market Order: যখন বাজারে লেনদেন এর জন্য কোন অর্ডার দেয়া হয় যা বাজারের বর্তমান মূল্যে সেই মুহূর্তে সম্পাদন করা হয় তাকে Market order বলে।

Limit Entry Order: যখন আপনি বর্তমান বাজার দর অপেক্ষা কম দামে কোন মুদ্রা কিনতে চান অথবা বর্তমান বাজার দর অপেক্ষা বেশী দামে কোন মুদ্রা বিক্রি করতে চান তবে যে অর্ডার (Order) দেন তাকে Limit Entry Order  বলে। এটা একটু বিভ্রান্তিকর মনে হয়। উদাহরণ দেখা যাক- EUR/USD এর বর্তমান বাজার দর ১.৩২০০ আছে। এখন আপনি যদি এর দাম কমে ১.৩১৫০ হলে তখন তা কিনতে চান তবে আপনি Limit Buy Order  দিবেন। এর ফলে EUR/USD এর দর ১.৩২০০ হতে কমে ১.৩১৫০ হওয়া মাত্র Automatic ঐ মুহূর্তেই আপনার অর্ডার কার্যকর হবে। এই অর্ডার এর সীমা বর্তমান বাজার মূল্য এর কম দরে নির্ধারণ করতে হবে।

আবার, EUR/USD এর বর্তমান বাজার দর ১.৩২০০ আছে। এখন আপনি যদি এর দাম বেড়ে ১.৩২৫০ হলে তখন তা বিক্রি করতে চান তবে আপনি Limit Sell Order দিবেন। এর ফলে EUR/USD এর দর ১.৩২০০ হতে বেড়ে ১.৩২৫০ হওয়া মাত্র যান্ত্রিকভাবে ঐ মুহূর্তে আপনার অর্ডার কার্যকর হবে। এই অর্ডার এর সীমা বর্তমান বাজার মূল্য এর বেশি দরে নির্ধারণ করতে হবে।

Stop Entry Order : যখন আপনি বর্তমান বাজার দর অপেক্ষা বেশী দামে কোন মুদ্রা কিনতে চান অথবা বর্তমান বাজার দর অপেক্ষা কম দামে  কোন মুদ্রা বিক্রি করতে চান তবে যে অর্ডার (Order) দেন তাকে Stop Entry Order  বলে। ধরা যাক আপনি কোন প্রতিবন্ধ অবস্থায় থাকা মুদ্রা কিনতে চান, তখন আপনি এই অর্ডার দিবেন যেন ঐ অবস্থা এর উন্নতি হয়ে আপনার নির্ধারিত দরে মূল্য পৌঁছালেই আপনার ক্রয়ের অর্ডার কার্যকর হবে। একইভাবে, আপনি কোন প্রতিবন্ধ অবস্থায় থাকা মুদ্রা বিক্রয় করতে চান, তখন আপনি এই অর্ডার দিবেন যেন ঐ অবস্থা এর নীচে যেয়ে আপনার নির্ধারিত দরে মূল্যে নামলেই আপনার বিক্রয়ের অর্ডার কার্যকর হবে।

Stop Loss: এটি একটি খুবই মজার এবং উপকারী কৌশল। এটি এমন একটি ব্যবস্থা যা আপনাকে ফরেক্স এর লেনদেন এ জড়িত ঝুঁকি এবং ক্ষতির পরিমাণ কমাতে সাহায্য করবে দারুণভাবে। এই অর্ডার এর মাধ্যমে আপনি যে কোন ক্রয় বা বিক্রয় করা মুদ্রার জন্য একটি সীমারেখা বেঁধে দেয়া যায় যে দর এর বাইরে মূল্য চলে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার লেনদেন টি বন্ধ হয়ে যাবে। আপনি এই অর্ডারটি যে কোন সময় চালু, বহাল, বাতিল বা পরিবর্তন করতে পারবেন এবং সেই মোতাবেক এটি কাজ করবে।

Trailing stop: এটিও একটি ক্ষতির সীমারেখা বেঁধে দেয়ার নির্দেশ তবে এটি বাজার দরকে অনুসরণ করে এবং সে অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। আপনি যখন এই অর্ডারটি দিবেন তখন তা বর্তমান বাজার দরের থেকে একটি নির্দিষ্ট দূরত্বে দিবেন যেন সেই রেখা পার হবার পর তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তিত হয়ে যায়। যেমন, EUR/USD তে আপনি যদি ৩০ PIPS এর Trailing stop দেন তবে এর দর ৩০ পিপস আপনার লাভের দিকে পার করলে এর ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের সীমাও উপরে উঠে আসবে। এর ফলে আপনি আপনার ট্রেড কে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন যেন তা অনেক উপরে উঠার সুযোগও পায় আবার বেশী ক্ষতি হবার ভয় ও থাকেনা। যেসব মুদ্রা ধারা অনুসরণ করে তাদের জন্য এই কৌশল খুব লাভ-দায়ক।

Good Till Cancelled Order: এটা সোজা কথায় এমন একটা অর্ডার যেখানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কিছু করা হবেনা যতক্ষণ আপনি নিজে তা করতে অর্ডার করছেন। এখানে লাভ-লোকসান যেদিকে যতই হক না কেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোন কিছু করা হয়না। ব্যবহারকারী নিজে মাউস টিপে যা করবেন তাই হবে যখন করবেন তখন। অনেকসময় ভুলবশত বা কোন সমস্যার ফলে এই অর্ডার দেয়া লেনদেন গুলতে অনাকাঙ্খিত বড় ক্ষতি হয়ে যায়।

Good For The Day: কোন লেনদেন সম্পর্কিত অর্ডার যদি সেই কার্যদিবসের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কার্যকর থাকে তবে তাকে Good For The Day বলে। ব্রোকার অনুযায়ী কার্যদিবস শেষ হয় বিভিন্ন সময়ে এবং এটা ঠিকমতো মাথায় রাখা উচিত।

One Cancels The Other Order:  এখানে দুটি আলাদা অর্ডার থাকে এবং তাদের একটি কার্যকর হলে আরেকটি বাতিল হয়ে যায়। অর্ডার গুলো ২টি Stop Entry Order, Stop loss, Limit Entry Order হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, EUR/USD এর মূল্য উঠবে না নামবে তা নিশ্চিত না হলেও যখন এর একটি পরিবর্তন অনুমান করছেন তখন আপনি ঐ আবদ্ধ দরের উপরে একটি ক্রয়ের অর্ডার দিতে পারেন নির্দিষ্ট সীমায় Stop loss অর্ডারসহ এবং আবদ্ধ দরের নীচে একটি বিক্রয়ের অর্ডার দিতে পারেন নির্দিষ্ট সীমায় Stop loss অর্ডারসহ। ফলে একদিকের শর্ত পূরণ হলেই সে অনুযায়ী অর্ডার কার্যকর হবে Stop loss সহ এবং বিপরীত অর্ডারটি বাতিল হয়ে যাবে। এতে আপনি যদি বড় কোন পরিবর্তন অনুমান করেন তবে তার দিক নিশ্চিত করতে না পারেন তবে এই কৌশলে মুনাফা করতে পারবেন।

One Triggers The Other Order:  One Cancels The Other Order এর মতই কিন্তু তার বিপরীত একটি অর্ডার। এখানে সবই একই রকম কিন্তু একটি অর্ডার দ্বারা আরেকটি অর্ডার বাতিল করা হয়না বরং কার্যকর করা হয়।

Lot/Contract size: ফরেক্স এ লেনদেন এর পরিমাণকে লট (Lot) দ্বারা প্রকাশ করা হয়। এগুলো সাধারণত ১/ স্বীকৃত(Standard)-১০০০০০ একক ২/ছোট(Mini) -১০০০০ একক ৩/ক্ষুদ্র(Micro) -১০০০ একক ৪/অতি ক্ষুদ্র(Nano) -১০০ একক এর আকারে  পাওয়া যায়।

পিপ(PIP) এর মূল্য কিভাবে বের করবেন?

এটা তো জানা হয়েছে যে মুদ্রাগুলো কে পিপ দ্বারা হিসাব করে, এবং পিপ হল মুদ্রাগুলোর মূল্য পরিবর্তন এর ক্ষুদ্রতম একক। এই ক্ষুদ্রতম এককে পরিবর্তিত মূল্য থেকে বড় আকারের মুনাফা অর্জন করতে হলে বেশী পরিমাণে মুদ্রা কেনাবেচা করতে হবে। এখন আমারা জানব আমাদের লট এর আকার আমাদের পিপ কে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। কিছু উদাহরণ দেখা যাক-

আমরা যদি স্বীকৃত(Standard)-১০০০০০ একক এর লট এর কথা ধরি তাহলে দেখা যাবে-

১। EUR-JPY= ১০০.৫০ হলে (.০১/১০০.৫০) x ১০০০০০=৯.৯৫ডলার প্রতি পিপ এ।

২। USD-CHF= ০.৯১৯০ হলে (.০০০১/০.৯১৯০) x ১০০০০০=১০.৮৮ডলার প্রতি পিপ এ।

যদি কোন Currency Pair এর quote currency USD হয় তবে একটি Standard-১০ ডলার প্রতি পিপ, Mini -১ ডলার প্রতি পিপ, Micro -০.১ ডলার প্রতি পিপ, অতি Nano -০.০১ডলার প্রতি পিপ হিসেবে ধরা হয়।

এখন লাভক্ষতির হিসাব করা যাক-

কিছু Currency Pair এর এর উদাহরণ দেখা যাক-

•          USD-CHF= ০.৯১৯১/০.৯১৯৫, এই বর্তমান দর এ আমরা যদি এটি বিক্রয় করতে  চাই তবে আমাদের ০.৯১৯১ ডাক দেয়া মূল্যে বিক্রি করে দিতে হবে।

•          ফলে এখন আমরা ১০০০০০ একক এর Standard Lot বিক্রি করে দিলাম ০.৯১৯১ দরে।

•          মনে করি পরের দিন দেখতে পেলাম যে জোড় এর মূল্য হ্রাস পেয়ে ০.৯০৯১/০.৯০৯৫ হয়ে গেছে অর্থাৎ আমরা ৯৬ পিপস এর মুনাফা হাতে পাচ্ছি।

•          এখন বিষয় হল এটার মূল্য কত? এটার ফলে কত ডলার/টাকা লাভ হবে?

•          এখন আমাদের লাভ তুলতে হলে অর্থাৎ লেনদেন সমাপ্ত করতে হলে USD-CHF= ০.৯৯১/০.৯০৯৫ এই পরিবর্তিত বর্তমান দর এর অর্থিত মূল্য এর দিকে নজর দিতে হবে। কারণ এখন আমরা বিক্রি করা মুদ্রাজোড় টি ক্রয় করে নিব আগের বিক্রয়মূল্যের থেকে কমে ০.৯০৯৫ মূল্যে।

•          তাহলে প্রথমে ০.৯১৯১ দরে বিক্রি করা মুদ্রা আমরা ০.৯০৯৫ দরে আবার কিনে নিচ্ছি। এতে আমাদের ৯৬ পিপস এর পার্থক্য দেখতে পাচ্ছি।

•          আমাদের লাভ করা এই ৯৬ পিপস হল (.০০০১/০.৯০৯৫) x ১০০০০০=১০.৯৯ডলার প্রতি পিপ x ৯৬ পিপস= ১০৫৫.০৪ ডলার।

ফলে আমরা এই সূত্র ব্যবহার করে কত পিপ এ, কত লট এ কত লাভ বা ক্ষতি হচ্ছে তা সহজেই বের করতে পারি।

এখন যদি উদ্ধৃত মুদ্রাটি হয় ডলার তবে এই কাজটি আরও সোজা। লট অনুযায়ী প্রতি পিপ এর জন্য যে ডলার হয় তাকে পিপ এর পরিবর্তন দিয়ে গুণ করলেই আমাদের লাভ বা লোকসান পাওয়া যাবে।

কিছু Currency Pair এর এর উদাহরণ দেখা যাক-

•          EUR/USD বর্তমান দর ১.৩২০০ এ আমরা বিক্রয় করতে  চাই ।

•          মনে করি পরের দিন দেখতে পেলাম যে জোড় এর মূল্য হ্রাস পেয়ে ১.৩১০০ হয়ে গেছে অর্থাৎ আমরা ১০০ পিপস এর মুনাফা হাতে পাচ্ছি।

•          ফলে এখন আমরা ১০০০০০ একক এর Standard Lot বিক্রি করলে ১০ ডলার প্রতি পিপ অনুযায়ী ১০০ পিপ এ ১০x১০০=১০০০ ডলার এর মুনাফা পেলাম

•          আবার আমরা ১০০০০ একক এর Standard Lot বিক্রি করলে ১ ডলার প্রতি পিপ অনুযায়ী ১০০ পিপ এ ১x১০০=১০০ ডলার এর মুনাফা পেলাম।

এটা সবসময় খেয়াল রাখতে হবে যে Bid, Ask এবং Spread প্রতি লেনদেন এর সাথেই থাকে এবং ক্রয়-বিক্রয়, লাভ-ক্ষতি হিসাবের সময় এদেরকে ধরেই হিসেব করতে হবে। ক্রয় করলে Ask এবং বিক্রয় করলে Bid  মূল্য ব্যবহার করা হয়।

চতুর্থ অংশ: পেশাদার ফরেক্স ট্রেডিং(Professional Forex Trading):

পেশাদার ফরেক্স ট্রেডিং কি? – ফরেক্স এর মাধ্যমে টাকা কামানো।

পেশাদার ফরেক্স ট্রেডার কি করে?

পেশাদার ফরেক্স ট্রেডার ফরেক্স বাজারে যেসব মূল্য পরিবর্তন দেখা যায় তার মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করে। এদের মূল লক্ষ্য হল যত বেশী সম্ভব লাভজনক কেনাবেচা করা এবং প্রতিটি লেনদেন থেকে সর্বাধিক লাভ বের করে আনা। একজন পেশাদার ফরেক্স বাজারের মূল্য পরিবর্তন এর রেখাচিত্র(Price Chart) ব্যবহার করে বাজার বিশ্লেষণ ও কেনাবেচা করে। বাজারের যেকোনো স্বাভাবিক-অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে নিজের জ্ঞান, বিশ্লেষণ ও তথ্য কাজে লাগিয়ে তারা নিজেদের পক্ষে টেনে আনে এবং তা হতে লাভ বের করে নেয়।

এটা খুবই লক্ষণীয় যে ফরেক্স কোন রাতারাতি টাকা কামানোর জায়গা নয়। সবাই যেভাবে বলে সে তুলনায় ফরেক্সে টাকা কামানো অনেক বেশী কঠিন। লাভজনক ব্যবসা চালাতে গেলে আমাদের যে শুধু লাভ-জনক কেনাবেচা করার কথা চিন্তা করতে হবে তা না, অবশ্যম্ভাবী ভাবে যেসব ট্রেড এ লোকসান হবে তাদের ক্ষতির পরিমাণও কমাতে হবে যেন তা আমাদের লাভের টাকা খেয়ে না ফেলে। আমাদের সবসময় ক্ষতি ও ঝুঁকির কথা মাথায় রাখতে হবে এবং প্রতি কেনাবেচার ফলে যে পরিমাণ অর্থ ঝুঁকির মধ্যে পরছে তা হারানোর জন্য এবং তার পরিমাণ কমানোর জন্য তৈরি থাকতে হবে।

ফরেক্স এর পেশাদার ট্রেডারদের বড় এক সুবিধা হল এর Technical Analysis যা Price Chart  দ্বারা করা হয়। এছাড়া Fundamental Analysis ব্যবহার করা হয়। সাধারণত পেশাদার ফরেক্স ট্রেডাররা উভয় বিশ্লেষণ প্রক্রিয়াই ব্যবহার করেন যৌথভাবে।

পেশাদাররা জানেন যে রেখাচিত্র বা Price Chart  বোঝাটা একটা বিশেষ কলা বা দক্ষতা। তারা কখনই ফরেক্স এর ব্যবসা যান্ত্রিক বা স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে (Automatic system) করেননা কারণ ফরেক্সের প্রতিটি পরিবর্তন ও ঘটনাই অনন্য এবং আগের থেকে আলাদা। ফলে আপনাকে ফরেক্সের জন্য এমন সক্রিয় ও যে কোন পরিস্থিতিতে মানানসই হওয়ার মতো কৌশল ও পরিকল্পনা প্রয়োগ করতে হবে যার সাফল্যর সম্ভাবনা সর্বাধিক।

দক্ষ ও অভিজ্ঞ পেশাদারেরা কি করেন?

পেশাদারদের জন্য অনেক কৌশল ও ব্যবস্থা আছে তারা ব্যবহার করেন কিন্তু তারা আসলে কোন জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে জেতে চাননা। তারা সাধারণত বাজারের মূল্য পরিবর্তনের তথ্য ও উপাত্ত ব্যবহার করে তাদের বিশ্লেষণ ও অনুমান করে থাকেন। ভালভাবে বোঝার জন্য আমরা ফরেক্স এ ব্যবহৃত কিছু কৌশল ও উপায় সম্পর্কে জানব।

স্বয়ংক্রিয়/যান্ত্রিক ব্যবস্থা( Automated / Robot Trading): বর্তমানের সফটওয়্যার-ভিত্তিক ফরেক্স ট্রেডিং এ কিছু মৌলিক নিয়মকে কম্পিউটার সংকেতে পরিণত করা হয় যেন কম্পিউটার তা বুঝতে ও ব্যবহার করতে পারে। এদেরকে Forex Trading Robot বলা হয়। কম্পিউটার সফটওয়্যার দিয়ে ঐ ফরেক্স বাজারের তথ্য নেয় এবং যেখানে দরকার সেই সংকেতগুলো প্রয়োগ করে যার ফলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লেনদেন করা হয়।

Discretionary trading: এটা মূলত ট্রেডারদের বাজার বিশ্লেষণ এর দক্ষতা এবং ইন্দ্রিয় অনুভূতি এঁর উপর নির্ভরশীল ট্রেডগুলোকে বুঝায়। এটি অনেক কার্যকর, সক্রিয় ও যেকোনো পরিস্থিতিতে মানানসই কৌশল তবে এই দক্ষতার জন্য অনেক সময় প্রয়োজন। বেশিরভাগ দক্ষ পেশাদারদের দেখা যায় Discretionary trading করতে কারণ এই সর্বদা পরিবর্তনশীল এই অতি-সক্রিয় বাজারে সবচেয়ে ভাল ফলাফল নিজের মনের কথা শুনলেই পাওয়া যায়।

কৌশলগত ট্রেড(Technical trading): প্রযুক্তিগত বা কৌশলগত বিশ্লেষণ ও ট্রেড হল বাজার মূল্যের রেখাচিত্র বিশ্লেষণ এবং তা থেকে কেনাবেচার সিধান্ত নেয়া। এখানে বাজারদরের বিন্যাস, রীতি এবং বিভিন্ন প্রতীক/ইশারা ব্যবহার করা হয়। এটা অর্থনীতির মৌলিক ধারনা যে প্রত্যেক অর্থনৈতিক ঘটনা/উপাদান এর পরিবর্তন রেখাচিত্রের মূল্য পরিবর্তন দ্বারা প্রকাশ ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

মৌলিক ট্রেড(Fundamental Trading): যখন ট্রেডাররা বাজারের বিভিন্ন খবর ও তথ্যের উপর ভিত্তি করে বিশ্লেষণ ও অনুমান করে তখন তাকে মৌলিক বা খবর-ভিত্তিক ট্রেড বলে। এটা ঠিক যে এসব খবর এর ফলে বাজার এর পরিবর্তন ধরা পড়ে তবে বেশীরভাগ সময় বাজার পরিবর্তন খবর এর তুলনায় ভিন্ন আচরণ করে। এর প্রধান কারণ লোকেরা যে কোন নির্দিষ্ট খবরের উপর ভিত্তি করে মুদ্রা কিনে থাকে এবং খবরের ঘটনা ঘটার পর তা বিক্রি করে দেয়। দক্ষ পেশাদারেরা বেশী নির্ভরশীল Fundamental analysis এর থেকে Technical analysis এর উপর  এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এদেরকে যৌথভাবে ব্যবহার করা হয়।

দৈনিক ট্রেড(Day Trade):  যখন ট্রেডাররা কোন ফরেক্স এর কেনাবেচা কার্যদিবসের মধ্যেই করে ফেলে তখন তা Day Trade। তার মানে তারা একদিনের মধ্যেই অনেক ছোট ছোট কেনাবেচা করে নেয়।

Scalping:   খুবই ছোট ছোট আকারের, খুবই কম সময়ের জন্য এবং অনেক বেশী সংখ্যায় কেনাবেচা করাকে Scalping বলে। এটি এমন এক রীতি যেখানে আপনি একদিনেই বহুবার কেনাবেচা করবেন অল্প অল্প কিছু পিপ এর জন্য যেন সব মিলিয়ে যথেষ্ট মুনাফা সংগৃহীত হয়। এটা কোন গ্রহণযোগ্য কৌশল নয় আপনি যদি ভাল ও দক্ষ পেশাদার ফরেক্স ট্রেডার হতে চান। একে বাজি ধরাও বলা যেতে পারে।

Swing/Position Trade: এই কৌশলে ছোট থেকে মধ্যম আকারের কেনাবেচা করা হয় যা কিছু ঘণ্টা হতে কিছু দিন এর জন্য হতে পারে। এখানে বাজার রেখাচিত্রের দৈনিক গতিবিধির উপর ভিত্তি করে ট্রেড করা হয় এবং মাসে ৫-১০ টার মত কেনাবেচা করা হয়।

Range trading: বাজার অনেকসময় বিভিন্ন সাম্য বা বদ্ধ অবস্থায় থাকে যা থেকে একটি বড় পরিবর্তন এর সঙ্কেত লক্ষ্য করা যায় ঐ নির্দিষ্ট সীমানায় বাজার অবস্থান করলে। এ অবস্থায় বড় লাভের উচ্চ-সম্ভাবনাময় ট্রেডগুলো হল Range trading যেখানে ঝুঁকি ও সম্ভব্য ক্ষতির পরিমাণও বেশী।

Trend Trade : এখানে বাজারে একটি নির্দিষ্ট ধারার জন্য অপেক্ষা করা হয় এবং সেই ধারা ধরে যেসব উচ্চ-সম্ভাবনাময় বড় পরিবর্তনগুলো হয় তা অনুযায়ী ট্রেড করে মুনাফা অর্জন করে। উচ্চ-ধারা(Uptrend) হল যখন উঠতে বা নামতে থাকা উভয় রেখা উপরে উঠতে দেখা যায়। নিম্ন-ধারা(Down trend) হল যখন উঠতে বা নামতে থাকা উভয় রেখা নিচে নামতে দেখা যায়। এই ধারা-প্রবণতার বাজারে ট্রেডারদের সবচেয়ে ভাল সুযোগ থাকে অনেক বেশী মুনাফা অর্জনের। তবে যারা ভুল করে এবং সবচেয়ে উপরের ও নিচের দর খুঁজে বেড়ায় তারা বেশিরভাগ সময় বড় ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তায়, বেশীরভাগ পেশাদারেরা ধারা-প্রবণতার ট্রেডই করে থাকে।

Counter-trend Trade :  ধারা সবসময় টিকে থাকেনা ফলে দক্ষ ও জ্ঞানী ট্রেডাররা ধারার বিপরীতে ট্রেড করতে পারেন। তবে এর ঝুঁকির পরিমাণ খুবই বেশী এবং খুব পাকা না হলে এটি করা উচিত নয়। এখানে অনেক ধরনের অস্বাভাবিক ও অনিয়মিত রীতি বহির্ভূত উঠানামা হয় যা এই ট্রেড এর অংশ।

Carry Trade: Carry Trade  হল নিম্ন লাভজনক মুদ্রা দ্বারা উচ্চ লাভজনক মুদ্রা কিনে তা অনেকদিন পর্যন্ত ধরে রাখা। এতে ব্রোকার এর কাছ থেকে প্রতিদিন তাদের যে মুনাফা বৃদ্ধির পার্থক্যের সমপরিমাণ অর্থ পাওয়া যায়। এখানে মূল প্যাঁচ হচ্ছে যে, উচ্চ-মুনাফার মুদ্রাগুলো বেশী কেনাবেচা হয় যখন বাজারে ঝুঁকির পরিমাণ কমে যায়। কারণ, এই মুদ্রাগুলো খুব বেশী ঝুঁকিপূর্ণ মূল্য পরিবর্তনের ক্ষেত্রে। তাই আপনি এসকল মুদ্রা কিনে অনেক উপরে Trailing stop loss দিতে পারেন যেন বাজার আপনার অনুকূলে গতিশীল হলে আপনি বিশাল মুনাফা করতে পারেন।

পেশাদার বনাম কাঁচা ফরেক্স ট্রেডারঃ

পেশাদার ফরেক্স ট্রেডারদের কৌশল ও লক্ষ্য নতুন ও কাঁচা ট্রেডারদের অনেক সময় কঠিন, ভ্রান্ত বা আজব মনে হতে পারে। এই দুই ধরনের ট্রেডার দের মধ্যে অনেক বড় বড় পার্থক্য আছে যা ভাল ও দক্ষ ট্রেডার হওয়ার জন্য অবশ্যই জানতে ও উন্নতি করতে হবে।

পেশাদার:

১। একটি কার্যকর কৌশল ও লাভজনক ও সম্ভাবনাময় পরিকল্পনা রপ্ত করেছেন।

২। লাভজনক ও সম্ভাবনাময় পরিকল্পনা-মাফিক কাজ করেন।

৩। সকল ট্রেড এর জন্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা করেন নিখুঁতভাবে।

৪। ফরেক্স ট্রেডগুলোর জন্য একটি নিবন্ধ রয়েছে যা নিয়মিত ব্যবহার করেন।

৫। কখনই আবেগের বশবর্তী হন না।

৬। মুনাফা দেখা মাত্রই তা গ্রহণ বা নিশ্চিত করেন।

৭। ক্ষতির পরিমাণ হিসাব করে রাখেন এবং হিসেবের বাইরে ক্ষতি হতে দেন না।

৮। অতিরিক্ত কেনাবেচা করেননা।

কাঁচা ট্রেডারঃ

১। কোন কার্যকর কৌশল ও লাভজনক ও সম্ভাবনাময় পরিকল্পনা রপ্ত করেননি।

২। কোন পরিকল্পনা-মাফিক কাজ করেননা।

৩। ট্রেড এর জন্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা/নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননা।

৪। ফরেক্স ট্রেডগুলোর জন্য কোন নিবন্ধ ব্যবহার করেননা।

৫।আবেগের বশবর্তী হয়ে কেনাবেচা করে থাকেন।

৬। মুনাফা বৃদ্ধির লোভে শেষে লোকসান করেন।

৭। ক্ষতির পরিমাণ হিসাব করেন না এবং সামর্থ্যের বেশী ক্ষতি করে ফেলেন।

৮। অতিরিক্ত কেনাবেচা করেন।

ফরেক্স এ ব্যাংকগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকাঃ

ফরেক্স এ ব্যাংকগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে বেশীরভাগ কাজকর্ম হয় বড় বড় ব্যাংক, সংরক্ষিত তহবিল এবং বিশাল সব বিনিয়োগকারীদের নিয়ে ও তাদের কাজের উপর। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো প্রতিদিনের বিশাল বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনের মাধ্যমে বাজারের তারল্য বজায় রাখে। কিছু হয় তাদের মক্কেলদের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন ও রূপান্তর করার জন্য ও কিছু ব্যাংকের নিজস্ব কেনা-বেচার মাধ্যমে লাভের জন্য। মূল কথা হচ্ছে যে,  বড় বড় ব্যাংক, সংরক্ষিত তহবিল এবং বিশাল সব বিনিয়োগকারীদের দ্বারা এই বাজার কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব যা আমাদের মতো খুচরা বিনিয়োগকারীদের কোন চিন্তারই বিষয় নয়। আমরা ওইসব হেরফের এর খবর থেকে কিছু মুনাফা করতে পারি শুধু।

৫ম অংশ: মৌলিক বিশ্লেষণ (Fundamental Analysis)

Fundamental Analysis কি?

Fundamental Analysis হল কিভাবে সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক ও অন্যান্য ঘটনা ও সংবাদ বাজারকে প্রভাবিত করে। মৌলিক বিশ্লেষণ এর ক্ষেত্রে সব রকম ঘটনা, খবর, সামাজিক আন্দোলন, অর্থনৈতিক ঘোষণা, সরকারী নীতির পরিবর্তন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লাভক্ষতিও হিসেবের মধ্যে পড়ে। এর মধ্যে দেশের ব্যাংকগুলোতে সুদের হার এবং তা সম্পর্কিত নীতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাথমিক ধারনা এই যে, যদি কোন দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক অবস্থা শক্তিশালী হয় তবে তাদের মুদ্রার মূল্যও তেজী হবে। একটি শক্তিশালী অর্থনীতি সে দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ ও ব্যবসার ব্যাপক প্রসার ঘটায়। এর জন্য বৈদেশিক ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের সে দেশের মুদ্রা কিনতেই হয় বিনিয়োগ ও ব্যবসার জন্য। ফলে এখন মুদ্রার চাহিদা-যোগানের কথা চলে আসলো। যে দেশের অর্থনীতি মজবুত ও বর্ধনশীল, সে দেশের মুদ্রার প্রচুর চাহিদা তৈরি হয় যা তার যোগানের উপর চাপ ফেলে এবং তার দাম বাড়িয়ে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হতে শুরু করে তবে অন্যান্য দেশের মুদ্রার তুলনায় তাদের মুদ্রার দর বৃদ্ধি পাবে। অর্থনৈতিক অবস্থার সাথে সাথে মুদ্রার মূল্য বৃদ্ধির একটা বড় কারণ হল যে দেশের সরকার অর্থনৈতিক অবস্থা ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সুদের হার বৃদ্ধি করে। অধিক সুদের হার বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় এবং তারা এর ফলে বেশী বেশী অস্ট্রেলিয়ান ডলার কিনবে বিনিয়োগের জন্য। এতে এই মুদ্রার চাহিদা ও মূল্য বারতে থাকেবে এবং যোগান হ্রাস পাবে।

ফরেক্সের জন্য প্রধান অর্থনৈতিক ঘটনা:

এখন দেখা যাক কিছু প্রধান অর্থনৈতিক ঘটনা যা মুদ্রার মূল্য পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। এগুলো কিছু অর্থনৈতিক পরিভাষা মাত্র যা ফরেক্স এ কম বেশী জড়িত। এগুলো নিয়ে খুব বেশী মাথা ঘামানর দরকার নেই। আপনার শুধু আমাদের প্রদত্ত ফরেক্স ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংবাদগুলোতে চোখ রাখলেই হবে।

মোট দেশজ উৎপাদন(Gross Domestic Product-GDP): GDP হল অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এর মান অর্থবছরের প্রতি তিন মাস পর প্রকাশ করা হয় যা প্রকাশের আগের তিন মাসের কাজের ফলাফল তুলে ধরে। GDP হল গত তিন মাসে ঐ দেশের অর্থনীতিতে উৎপাদিত সকল পণ্য ও সেবার মোট  মূল্যমান। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক হিসাব নিকাশ অন্তর্ভুক্ত নয়।

Trade Balance:  Trade Balance বলতে কোন দেশের সকল পণ্য ও সেবার আমদানি ও রপ্তানির পার্থক্য কে বোঝায়। কোন দেশের বিনিময়ের ভারসাম্য এবং আমদানি-রপ্তানির পরিবর্তন তাদের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির একটি বহুল ব্যবহৃত সূচক। রপ্তানির পরিমাণ আমদানি অপেক্ষা বেশী হওয়া উচিৎ। এতে অর্থনৈতিক উন্নতি এবং উৎপাদন ক্ষমতার বিকাশ ঘটে।

Consumer price index(CPI): মুদ্রাস্ফীতি নির্ণয়ের সবচেয়ে ভাল নির্দেশক। এটি প্রতি মাসের ১৫ তারিখে প্রকাশিত হয় যা আগের মাসের চিত্র তুলে ধরে। এটি প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ ভোগ্য পণ্যের ও সেবার  মূল্যের মাসিক পরিবর্তন নির্দেশ করে।

Producer’s price index-(PPI): মুদ্রাস্ফীতি নির্ণয়ের আরেকটি সবচেয়ে ভাল নির্দেশক। এটি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রকাশিত হয় যা আগের মাসের চিত্র তুলে ধরে। PPI প্রতি মাসে পাইকারি ভাবে মোট উৎপন্ন পণ্যের মূল্য নির্দেশ করে। ফলে CPI দিয়ে আমরা বুঝি যে ভোক্তারা পণ্যের জন্য কি পরিমাণ খরচ করছে এবং PPI দ্বারা বুঝি যে ঐ পণ্যের জন্য উৎপাদনকারীরা কি মূল্য পাচ্ছে।

কর্মক্ষমতার নির্দেশক(Employment Indicator): প্রতি মাসে দেশের কর্মক্ষমতার প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এতে বেকারত্বের হার(যে পরিমাণ জনশক্তি কাজে নিয়োজিত হতে পারছেনা ), নতুন সৃষ্টি হওয়া চাকুরীর সংখ্যা, সাপ্তাহিক গড় কত ঘণ্টা কাজ হয়েছে, সাপ্তাহিক ঘণ্টা প্রতি গড় আয়ের বিবরণী দেয়া হয়। এই ঘোষণা বাজার পরিবর্তনে যথেষ্ট ভূমিকা রাখে। NFP(Non- farm employment report) এর কথা প্রায়ই ট্রেডারদের মুখে শোনা যায় যা বাজারে গতি সৃষ্টিতে বিশাল ভূমিকা রাখে।

দীর্ঘ-মেয়াদী পণ্যের বিক্রি(Durable goods orders):এই বিবরণীতে হিসাব দেয়া হয় যে দেশের মানুষ দীর্ঘ-মেয়াদী পণ্য ক্রয়ের জন্য কি পরিমাণ খরচ করছে। দীর্ঘ-মেয়াদী পণ্য বলতে যেগুলো ৩ বছর বা তার বেশি দিন তিকে তাদের বোঝায়। এটি প্রতি মাসের শেষ সপ্তাহে প্রকাশিত হয় যা উৎপাদন-শিল্পের অবস্থা সম্পর্কে খুব উৎকৃষ্ট নির্দেশক হিসেবে কাজ করে।

খুচরা বিক্রয়ের সূচক(Retail sales Index): এটি খুচরা বিক্রয়ের মাধ্যমে বিক্রিত মোট পণ্যের হিসাব নির্ণয় করে। এটি বিশাল পণ্য বিক্রয়ের ক্রমিক শৃঙ্খল থেকে শুরু করে মুদি দোকানের বিক্রি পর্যন্ত হিসাব করে। এতে দেশের মধ্যে খুচরা দোকানগুলোর থেকে নেয়া নমুনার মাধ্যমে হিসাব করা হয়। এটি প্রতি মাসে আগের মাসের তথ্য দ্বারা প্রকাশিত হয়।

গৃহ-সংস্থান তথ্য(Housing Data): গৃহ-সংস্থান তথ্য দ্বারা প্রতি মাসে তৈরিকৃত মোট গৃহের সংখ্যা ও আগের তৈরিকৃত গৃহের কেনাবেচার হিসাব প্রকাশ করা হয়। গৃহ নির্মাণ কার্যকলাপ দেশের অর্থনৈতিক বিকাশের অন্যতম উৎস। ফরেক্স এ এই তথ্য অত্যন্ত গুরুত্ব-পূর্ণভাবে দেখা হয়। গৃহ কেনাবেচার সংখ্যা অর্থনৈতিক অবস্থা পরিমাপের একটি দারুণ নির্দেশক। গৃহ নির্মাণ ও কেনাবেচা কম হলে তা দেশের দুর্বল অর্থনীতির সঙ্কেত প্রকাশ করে।

সুদের হার(Interest Rates): সুদের হার ফরেক্স এর প্রধান চালিকাশক্তি। উপরে বর্ণিত অর্থনৈতিক সূচকগুলো কেন্দ্রীয় মুক্ত বাজার কমিটি দ্বারা পর্যবেক্ষণ করা হয় দেশের অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি বোঝার জন্য। এরপর তারা সেই অনুযায়ী সুদের হার হ্রাস-বৃদ্ধি ও নিয়ন্ত্রণ করেন দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা অনুযায়ী। যদিও সুদের হার ফরেক্স এর মূল্য পরিবর্তন এর মূল চালিকাশক্তি, তবুও বাকি নির্দেশক গুলোও যথেষ্ট প্রয়োজনীয়।

Technical বিশ্লেষণ বনাম Fundamental বিশ্লেষণ:

অর্থনৈতিক বাজারে বিনিয়োগ ও ব্যবসা করার জন্য যে দুটি প্রধান চিন্তাধারা প্রচলিত আছে তা হল প্রযুক্তিগত(Technical) বিশ্লেষণ ও মৌলিক(Fundamental) বিশ্লেষণ। Technical বিশ্লেষণে বাজারমূল্যের গতিপথ ও অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে সে অনুযায়ী ভবিষ্যৎ মূল্য পরিবর্তন অনুমান করে। Fundamental এর ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক খবরাখবর বিশ্লেষণ করা হয়। যেহেতু সকল বৈশ্বিক খবরাখবর সকল অর্থনৈতিক বাজারকে প্রভাবিত করে, সেহেতু অনেক Technical খবরও অর্থনৈতিক ঘটনার অন্তর্ভুক্ত। এটা একটা খুব দরকারি কথা যা অনেক মৌলিক বিশ্লেষক মানতে চান না।

Technical Analysis কে প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার অন্যতম প্রধান যুক্তি হল পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ ঘটনা ও খবর প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে যা প্রতি মুহূর্তে একসাথে বাজারগুলোকে প্রভাবিত করে। মুদ্রা বাজার সবচেয়ে বেশী প্রভাবিত হয় দেশের সুদের হার ও GDP সঙ্ক্রান্ত ঘটনা ও খবর দ্বারা। কিন্তু যুদ্ধ-বিগ্রহ, চুক্তি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগর প্রভাবও বাজারে ভাল প্রভাব ফেলে থাকে। যেহেতু এতগুলো এতরকম ঘটনা যেগুলো আলাদাভাবে মুদ্রার মূল্য পরিবর্তনের প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। ফলে তাদের সবাইকে অনুসরণ করে কোন যথেষ্ট কার্যকরী ফলাফল পাওয়া যায়না।

Technical Analysis এর বিরুদ্ধে একটি বড় যুক্তি হল যে অতীতের তথ্য বিশ্লেষণ করে কখনও ভবিষ্যতের মূল্য পরিবর্তনের গতিপথ নির্ণয় করা যায়না। এর চেয়ে বাস্তব ঘটনা ও খবরের উপর ভিত্তি করে অনেক নির্ভরশীল অনুমান করা যাবে। এই যুক্তির বিরুদ্ধে দুটি কথা বলা যেতে পারে।

১। যদি এটা বলা হয় যে অতীতের তথ্য কোন গুরুত্ব বহন করেনা তবে এটা প্রমাণ করতে হবে যে, কেন রেখাচিত্রের অনুভূমিক স্তর(Horizontal level) ও আবদ্ধ অংশগুলো(Resistance) কেন এত ইঙ্গিতবহ ও অর্থপূর্ণ হয়। এটাও প্রমাণ করতে হবে যে, কেন শুধুমাত্র কয়েকটি শক্তিশালী বাজার বিশ্লেষণ ও ভবিষৎবাণীর হাতিয়ার বা পদ্ধতি ব্যবহার করে কৌশলী ও প্রযুক্তি-শীল ট্রেডাররা এত সফলতা ও মুনাফা অর্জন করে। যে কেউ যদি কিছু সময় নিয়ে বাজারের রেখাচিত্রের পর্যবেক্ষণ করে তবে অবশ্যই তাকে মানতে হবে যে এগুলো কত কার্যকরী এবং বিশ্লেষণ ও ভবিষৎবাণীর সফল হাতিয়ার।

২। আরেকটি কথা বলা হয় যে, ভবিষ্যৎ ঘটনা ও তার খবর দ্বারা ফরেক্সের গতিপথ বেশী নিখুঁতভাবে অনুমান করা যায়। কিন্তু কোন অভিজ্ঞ কারো সাথে কথা বললে জানতে পারবেন যে অনেকসময়, বাজার কোন নির্দিষ্ট খবর বা ঘটনার বিপরীত দিকে ছুটছে বলে দেখা যায়। খবর অনুযায়ী বাজার পরিবর্তন হয় তবে তা খুব বেশী নিশ্চিত কোন কিছু নয়। এর উপর ভরসা করে পরিকল্পনা সাজানো বকামিই মনে হতে পারে। বাজার আসলে চলে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও প্রত্যাশার উপর। এটাই বিনিয়োগ ও ব্যবসার বাস্তবতা। এখন কেউ যদি Technical Analysis ছাড়াই বাজার মূল্যের বিশ্লেষণ ও কেনাবেচা করে তবে তা আসলেই বোধগম্য কাজ নয়। উদাহরণ দ্বারা বোঝার চেষ্টা করি। যদি NFP এর প্রতিবেদনে বলা হয় যে আগামী মাসে আমেরিকাতে এক লাখ নতুন চাকুরীর সৃষ্টি হবে তাইলে ডলার এর মূল্য কিছুটা উঠবে এই আশায় যে আরও উৎপাদন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে। ফলে মৌলিক বিশ্লেষণ দ্বারা বলা যাবে যে ডলার এর মূল্য বাড়বে। কিন্তু কোন কারণে এটা স্বাভাবিক যে হয়ত সে পরিমাণ লোক নিয়োগ দেয়া হলনা। ফলে, ডলার এর মূল্য অনেক বেশী পড়ে যাবে কারণ আশানুরূপ ফলাফল খবর অনুযায়ী পাওয়া যায়নি। আপনি এখন সহজেই বুঝতে পারছেন যে এই খবর, ঘটনা ও বিশ্লেষণ কতটা অ-নির্ভরযোগ্য, জটিল এবং প্রায়ই অগুরুত্বপূর্ণ।

সবশেষে চূড়ান্তভাবে যা বলা যায়: যেহেতু বিভিন্ন খবরের ফলে অনুমিত সকল সম্ভাবনার পরিণতি রেখাচিত্রে বা Price Chart এ দেখাই যায়, সেহেতু এই রেখাচিত্র বিশ্লেষণ(Price chart analysis) করে ট্রেড করা শিখলেই তো হয়। বিভিন্ন খবর এর ফলে আমরা মূল্য পরিবর্তনের যে ভবিষৎবাণী করতে পারি, তা সেটা ছাড়াই Technical Analysis এর মাধ্যমে করা যায়। ফলে এটি সবচেয়ে নিখুঁত, সফল, নির্ভরযোগ্য ও বাস্তবিক মাধ্যম বাজার বিশ্লেষণ, এর ভবিষৎবাণী ও এতে কেনাবেচা করার। এর মানে এটা বলা হচ্ছে না যে Fundamental Analysis এর কোন দরকারই নেই। মৌলিক বিশ্লেষণও কাজে লাগাতে হবে তবে তা আমাদের কৌশলের অংশ হিসেবে। এটা আমাদের সিদ্ধান্ত, কৌশল ও অনুমানের সম্ভাবনার শক্তি বৃদ্ধি করে এবং যখন আমরা সিদ্ধান্তহীনতায় পড়ি তখন তা থেকে বের হতে নির্দেশনা দেয়। তবে এটি কখনই আমাদের এককভাবে ফরেক্স ট্রেড এর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারেনা।

৬ষ্ঠ অংশ: Price Action Trading Analysis কি?

Price Action Trading Analysis সম্পর্কে আমাদের কথা: সময়ের তালে বাজারে মুদ্রার মূল্য পরিবর্তন এর পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করাকে Price Action Trading Analysis বলে। আমরা যদি বাজারে মূল্য পরিবর্তনের ক্রিয়া বুঝতে শিখি তবে আমরা বাজারের গতিপথ কোন দিকে যাবে তা নির্ণয় করতে পারব এবং মূল্য পরিবর্তনের পুনরাবৃত্তির নিয়ম ধরতে পারব অথবা মূল্য পরিবর্তনের একটি ছক হিসাব করতে পারব।

আরও সহজভাবে বলা যায়, Pricce Action Analysis হল মুদ্রার মূল্যের স্বাভাবিক পরিবর্তন ব্যবহার করে বাজার বিশ্লেষণ করা ও সে অনুযায়ী ট্রেড করা। তার মানে, আমরা শুধু সময়ের বিপরীতে মুদ্রার মূল্য পরিবর্তনের রেখাচিত্র (Price Chart) দেখে আমাদের কেনাবেচার সিদ্ধান্ত নিব।

প্রতিটি অর্থনৈতিক উপাদান তাদের প্রভাবে মূল্য পরিবর্তন করে এবং তা রেখাচিত্রের মাধ্যমে দেখা যায়। অর্থনৈতিক উপাদান এর প্রভাব মানুষ বা কম্পিউটার ধরতে পারলে বা না পারলেও এটি রেখাচিত্রে ঠিকই ধরা পড়ে। ফলে, প্রতিদিন অসংখ্য অর্থনৈতিক উপাদান পর্যবেক্ষণ করার চেয়ে রেখাচিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে ফরেক্স শিখা অতীব সহজ ও কার্যকর। এতে আমরা অর্থনীতির সবগুলো উপাদান বিশ্লেষণ করতে পারব শুধুমাত্র রেখাচিত্র দেখে ও বুঝে। এতে আমাদের বিশ্লেষণ ও ট্রেড হবে সহজ, দ্রুত এবং অধিক লাভজনক।

Price Action Analysis / Price Chart কিভাবে ফরেক্সে কাজে লাগাবেন?

রেখাচিত্রের বিশ্লেষণ করে যে কোন অর্থবাজারে কেনাবেচা করে লাভ করা যায়। কারণ এটা মূল্য পরিবর্তনের অতীতের তথ্য ব্যবহার করে। আমরা এখানে সবচেয়ে সেরা বাজারের কথা বলছি যা অত্যন্ত তরল যেখানে মুহূর্তেই কেনা-বেচা করা যায় এবং এর পরিবেশ সবসময়ই কেনাবেচার জন্য দারুণ থাকে ও খুবই চঞ্চল যেখানে রেখাচিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমেই দারুণ সফলভাবে ট্রেড করা যায়।

আমাদের চেষ্টা থাকবে যেন এই মূল্য পরিবর্তন বিশ্লেষণের পদ্ধতি আপনাদের এমনভাবে শেখানো যেন আপনারা মূল্য পরিবর্তনের কয়েকটি পরীক্ষিত ও উৎকৃষ্ট বিন্যাস (Setup/pattern) থেকেই কার্যকর ভাবে লাভজনক ট্রেড করতে পারেন। অনেক বেশী ঝামেলা ও কৌশলে মাথা ঢুকিয়ে প্যাঁচ লাগানোর কোন প্রয়োজন নেই। ফরেক্স এ প্রায়ই পরিচিত ও লাভজনক কিছু বিন্যাস ও অবস্থা দেখা দেয় যা আমরা অল্প কিছু কৌশল বিন্যাস শিখেই ধরতে পারব এবং অধিক লাভজনক ও সম্ভাবনাময় ট্রেড করতে পারব।

সব প্রথমে আমাদের যা করতে হবে তা হল, ফরেক্স এর রেখাচিত্র গুলো থেকে সবরকমের নির্দেশক (Indicator) তুলে ফেলা এবং শুধু নিজের পছন্দের রঙের স্তম্ভ গুলোকে রাখা। আপনি কিছু উদাহরণ দেখতে পারেন যেখানে একদিকে বহুল ব্যবহৃত নির্দেশকগুলো সহ রেখাচিত্র ও একেবারে ফাঁকা ও সরল রেখাচিত্রের মধ্যে কোনটি বেশী সহজ ও বোধগম্য মনে হচ্ছে তা আপনিই খেয়াল করুন।

সরল ও ফাঁকা রেখাচিত্রের চেয়ে অনেক নির্দেশক দিয়ে ভরা রেখাচিত্র গুলোতে আসল স্বাভাবিক মূল্য প্রবাহ বোঝাই যাচ্ছেনা এবং সবকিছু গোলমেলে মনে হচ্ছে। আমরা যদি স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত মূল্যের রেখাচিত্র বিশ্লেষণ করে ট্রেড করতে চায় তবে আমাদের সহকারী গোলমেলে নির্দেশকগুলো ব্যবহার না করলেও চলবে।

৭ম অংশ: পরিচিত হউন ফরেক্স এর Price Chart সাথে

ভূমিকা: এখানে আমরা ফরেক্স এ ব্যবহৃত সবচেয়ে সাধারণ তিন রকমের Price Chart সম্পর্কে জানব। আমরা যেটি সবচেয়ে বেশী ব্যবহার করি তা হল মোমবাতির মতো রেখাচিত্র যাকে Candlestick বলে। এটা সবচেয়ে সেরা রেখাচিত্র হিসেবে ধরা হয় যা দারুণভাবে বাজারে মূল্যের গতিপথ নির্দেশ করে, কারণ এর মাধ্যমে যে কোন মুদ্রার মূল্য পরিবর্তনের শক্তিমত্তা চিত্রায়িত হয় পরিষ্কারভাবে। এখন, আমরা তিনটি মূল রেখাচিত্রের সম্পর্কে প্রাথমিক ধারনা নিব।

Line chart: এই লেখচিত্র দ্বারা বাজারের সার্বিক গতিবিধির একটা ত্বরিত ধারনা পাওয়া যায় এবং সহায়ক ও প্রতিবন্ধক স্তরগুলোও দেখা যায় সহজেই। এগুলো একেবারে নিখুঁত ও আসল মানগুলো দেখায় না কারণ এখানে প্রতিটি পরিবর্তনের জন্য আলাদা ভাবে লেখ দেখা যায় না। কিন্তু কেউ যদি বাজারে যে কোন সময়ের গতিবিধি পরিষ্কারভাবে দেখতে চায় তবে তাকে সেই সময়ের Line chart দেখতে হবে।

line chartএটি তৈরি করা হয় এক সময়ের সাথে তার পরবর্তী সময়ের সর্বোচ্চ দর, সর্বনিম্ন দর, খোলা বা বন্ধ অবস্থা কে জোড়া লাগিয়ে। সাধারণত, কোন সময় বাজার বন্ধের সময় উদ্ধৃত মূল্য(Closing Price) থেকে তার পরবর্তী সময়ের উদ্ধৃত মূল্য পর্যন্ত জোড়া লাগানো রেখাচিত্র কে সবচেয়ে কার্যকরী ধরা হয়। কারণ, বাজার বন্ধের সময় উদ্ধৃত মূল্য(Closing Price) কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয় কারণ তার দ্বারা বাজার উঠানামার খেলায় শেষ হাসি কে হাসল তা বোঝা যায়।

Bar chart: Bar Chart-এ প্রতি সময়সীমায় বাজারদরের জন্য একটি করে স্তম্ভ থাকে। ফলে আপনি যদি দৈনিক স্তম্ভ-লেখ দেখেন তবে প্রতিদিনের জন্য বাজারদরের একটি করে স্তম্ভ দেখতে পাবেন এবং যদি ৪ ঘণ্টার স্তম্ভ-লেখ দেখেন তবে ৪ ঘণ্টার  জন্য বাজারদরের একটি করে স্তম্ভ দেখতে পাবেন। প্রত্যেকটি স্তম্ভ আপনার জন্য চারটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিবে- কোন সময়ের শুরুতে মূল্য (Opening price), উদ্ধৃত মূল্য (Closing price), সর্বোচ্চ মূল্য ও সর্বনিম্ন মূল্য।

Bar chartCandlestick: এটা অনেকটা স্তম্ভ-লেখ এর মতো তবে এটা দেখতে আরও মজার ও কার্যকরী। এটিও খাঁড়া রেখা দ্বারা সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন মূল্য প্রকাশ করে যে কোন সময়সীমার জন্য। উপরের রেখাকে ঊর্ধ্বতন লেশ (Upper Shadow)এবং নিচের রেখাকে নিম্নতর লেশ (Lower Shadow) বলে। এদেরকে সলতেও (Wicks) বলা হয়। এই লেখচিত্রের প্রধান পার্থক্য হল এর শুরুতে মূল্য (Opening price) ও উদ্ধৃত মূল্য (Closing price) প্রকাশের ব্যবস্থায়। এর মধ্যের মোটা স্তম্ভ দিয়ে শুরু ও শেষের মূল্যের ব্যাপ্তি দেখানো হয় যাকে লেখের মূল দেহ বলা হয়। এখন যদি এই মোটা জায়গাটা গাঢ় রঙের অথবা ভরা থাকে তবে তা দিয়ে বোঝায় যে মুদ্রার দর ঐ সময়ে উঁচুতে শুরু হয়েছে এবং কমে বন্ধ হয়েছে। অপরপক্ষে, যদি এই মোটা জায়গাটা হাল্কা রঙের অথবা খালি থাকে তবে তা দিয়ে বোঝায় যে ঐ সময়ে মুদ্রার দর নিচুতে শুরু হয়েছে এবং বেড়ে বন্ধ হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোন সাদা বা হালকা রঙের অংশ দেখি তবে বুঝব যে তার উপরটি শেষ বা উদ্ধৃত দর প্রকাশ করছে এবং নীচটি শুরুর দর প্রকাশ করছে। আবার, যদি কোন কাল বা গাঢ় রঙের অংশ দেখি তবে বুঝব যে তার নীচটি শেষ বা উদ্ধৃত দর প্রকাশ করছে এবং উপরটি শুরুর দর প্রকাশ করছে। আপনি ইচ্ছামত এই রঙ নির্ধারণ করতে পারেন। যে রঙ দিলে আপনার দরের উঠানামা বুঝতে সুবিধা হবে এবং কোথায় দর শুরু আর কোথায় শেষ হয়েছে তাও খেয়াল থাকবে সে অনুযায়ী রং নির্ধারণ করাই উচিত হবে।

Candlestick Chartএই Candlestick Chart-ই হল সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সুবিধাজনক রেখাচিত্র যা আমরা আপনাকে ব্যবহারের জন্যও উপদেশ দিব। এর দ্বারা সবচেয়ে সহজে ও দৃষ্টিনন্দন ভাবে বাজারদর পর্যবেক্ষণ করা যায়।

৮ম অংশ: ফরেক্স ট্রেডিং এর কৌশল কি?

ফরেক্স ট্রেডিং এর কৌশল: ফরেক্স এ ট্রেড করার অনেক কৌশল রয়েছে। সেগুলো জানার এবং ব্যবহারের আগে আমাদের বাজারের রেখাচিত্র গুলো জানা এবং বোঝা দরকার। রেখাচিত্র গুলোর প্রাথমিক বিষয় গুলো ভালভাবে আয়ত্ত করা আবশ্যক। এখন টেকনিক্যাল বিশ্লেষণ করার প্রাথমিক বিষয়গুলো দেখা যাক।

Support Level ও Resistance Level – কিভাবে এগুলো চিহ্নিত ও শনাক্ত করবেন?

বাজারমূল্য উঠলে Support level তৈরি হয়। ধরুন, বাজারমূল্য যদি কমতে কমতে এক সময় লাফিয়ে আবার উপরে উঠে এবং বাড়তে থাকে তবে এটা একটা সহায়ক তল তৈরি করেছে অথবা পূর্বের কোন Support level  এ ফিরে এসেছে বলে ধরা হয়।

বাজারমূল্য কমলে প্রতিবন্ধক বা Resistance level তৈরি হয়। ধরুন, বাজারমূল্য যদি বাড়তে বাড়তে এক সময় লাফিয়ে আবার নিচে নামে এবং কমতে থাকে তবে এটা একটা প্রতিবন্ধক তল তৈরি করেছে অথবা পূর্বের কোন প্রতিবন্ধক অবস্থানে ফিরে এসেছে বলে ধরা হয়।

নির্দিষ্টভাবে ও একেবারে মাপমতো   Support and resistance Level ধরতে পারার কোন প্রযুক্তি নাই। এটা মানুষের বুদ্ধি ও বোধশক্তির ব্যাপার। এটা তেমন কোন কঠিন বিষয়ও নয়। সহজেই রেখাচিত্রের মধ্যে এই অবস্থানগুলো নির্ণয় করা যায় এবং খুব দক্ষতা ও সাহসের সাথে এটা প্রায় সবাই করে থাকে। উদাহরণস্বরূপ…

এটা খুবই ভালভাবে খেয়াল রাখবেন যে, এই জিনিসগুলো কোন সুনির্দিষ্ট মাপকাঠি নয়। অনেকে এগুলোকে খুব নির্দিষ্ট মাপকাঠি মনে করেন এবং এদের ধারে কাছের অবস্থানে কেনাবেচা হতে দূরে থাকেন। এর ফলে তাদের পর্যবেক্ষণ সঠিক বিশ্লেষণে অক্ষম হয় এবং তারা বেশীরভাগ লাভজনক ট্রেড হতে বিরত হন। আপনাকে Support and resistance Level এর পাশাপাশি বাজারের সার্বিক অবস্থাও সঠিকভাবে বুঝতে হবে। বাজারে কোনদিকে গতিধারা সৃষ্টি হলে তা এসব ভেঙ্গে এগিয়ে যায়। ফলে বাজারে যখন গতি থাকে তখন এসব নিয়ে বেশী ভাবার কোন দরকার নাই। বাজার কখন কোন সঙ্কেত দিচ্ছে তা ধরতে হবে। গতিধারা সৃষ্টি হলে অথবা বড় কোন Support বা resistance Level নির্দেশ করলে সে অনুযায়ী ট্রেড করতে হবে।

গতিধারা অনুযায়ী ট্রেড(Trend trading): বাজারমূল্য যখন পরিবর্তন হয় তখন তা থেকে আমরা মুনাফা অর্জন করার সুযোগ পায়। আমরা বাজারদর কোনদিকে যাচ্ছে তা ধরতে পারলে সেদিকে ট্রেড করে লাভ করতে পারি।

উচ্চ-মুখী ধারা (Uptrend) হল উঠতে বা নামতে থাকা সব মূল্যের ক্রমিক বৃদ্ধি এবং নিম্নধারা (Downtrend) হল উঠতে বা নামতে থাকা সব মূল্যের ক্রমিক হ্রাস।  তবে এই ধারা অবশ্যই এক সময় শেষ হয়। উদাহরণস্বরূপ আমরা একটা নিম্নধারা (Downtrend) এর দিকে তাকালেই দেখব যে তার উঠতে বা নামতে থাকা বিন্যাস একসময় ভেঙ্গে গেছে এবং এর পর আর সেই গতিধারা অনুযায়ী বাজার চলছেনা।

একটা ভাল কৌশল হল বিভিন্ন দিনে বাজার প্রবণতা কোন দিকে যাচ্ছে তা দেখে মূল্য উঠানামার সম্ভাবনাময় কোন গতিবিধি নির্ণয় করা এবং তা থেকে প্রতিদিন মুনাফা অর্জন করা। অর্থাৎ, আপনাকে বাজারমূল্যের গতিবিধি কিভাবে কোনদিকে তৈরি হয় তা বুঝতে হবে যেমন- Support Level তৈরি হয় যখন মূল্য উচ্চমুখী ধারার বাজারে নিম্নমুখী চক্র আসে এবং resistance Level তৈরি হয় যখন নিম্ন ধারার বাজারে উচ্চ মুখি চক্র আসে।

বাজারে জয়ার-ভাটা চলতেই থাকে, আপনি যদি এগুলো বুঝতে এবং কাজে লাগাতে পারেন তবে আপনি অবশ্যই একজন সফল ট্রেডার হতে পারবেন।

গতিধারার বিরুদ্ধে ট্রেড(Counter trend Trading):

Counter-trend Trade: এটি সবসময় টিকে থাকেনা ফলে দক্ষ ও জ্ঞানী ট্রেডাররা ধারার বিপরীতে ট্রেড করতে পারেন। তবে এর ঝুঁকির পরিমাণ খুবই বেশী এবং খুব পাকা না হলে এটি করা উচিত নয়। এখানে অনেক মূল্য পরিবর্তনের আদল বা রূপরেখা( price action pattern or setup) দেখতে পাওয়া যায় এবং নির্দিষ্ট সহায়ক বা প্রতিবন্ধক অবস্থা দেখা যায় যা আমাদের এই ট্রেড করার জন্য ভাল নির্দেশক বা সূচক হিসেবে কাজ করে।

Range-bound Market trading: বাজার কোন গতিধারার সীমায় আছে বলতে বোঝায় তা একটি সহায়ক ও প্রতিবন্ধক অবস্থার মধ্যে উঠানামা করছে। বাজার কোন সহায়ক ও প্রতিবন্ধক অবস্থার মধ্যে উঠানামা করছে এটা আমাদের জন্য খুব কাজের কথা। ফলে, বাজার কোন Support বা resistance Level এর কাছে গেলে আমরা কেনাবেচার এক দারুণ অবস্থা পেয়ে যায়। এখানে মুনাফার সম্ভাবনা খুবই বেশী এবং ঝুঁকি খুবই কম থাকে, কারণ ঝুঁকি সীমানার উপরে বা নিচের সহায়ক বা প্রতিবন্ধক অবস্থার উপর নির্ভর করে। বাজার যখন গতিপ্রবন হয় তখন তার সীমাতে নির্দিষ্ট কিছু আদল বা রূপরেখা( pattern or setup) দেখা যায় মূল্য পরিবর্তনের নির্দেশক হিসেবে।

Candlestick Charts and Patterns: এটা নিয়ে আগে আলোচনা করা হয়েছে। তবে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং এজন্য এর উপর আরও জোড় দেয়া উচিৎ।

স্বয়ংক্রিয় ফরেক্স ব্যবস্থা( automated Forex trading systems) সম্পর্কে কল্পনা: ফরেক্স এর বিভিন্ন কৌশল ও দিক নিয়ে আলোচনা করতে গেলে এর স্বয়ংক্রিয় ট্রেড (automated robot) এবং নির্দেশক ভিত্তিক ট্রেড (indicator-based trading) ব্যবস্থা সম্পর্কে কিছু বলা উচিৎ যা নিয়ে অনেক কল্পনা ঢুকে আছে মানুষের মনে। অনেক প্রতিষ্ঠান ও ওয়েব সাইট বলে থাকে যে তারা সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ট্রেড করতে দিবে যেখানে কম্পিউটার যখন বলবে তখন মাউস চাপলেই মুনাফা অর্জন করা যাবে। আপনাদেরকে মনে রাখতে হবে যে খুব বেশী সোজা আর খুব বেশী লাভের কথা শুধু ধোঁকাবাজরাই বলে। এরকম অনেক রোবট ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ও ওয়েব সাইট আছে যেগুলো থেকে সবসময় দূরে থাকা উচিৎ।

অনেক স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার গুলো তাদের অবিতর্কিত সাফল্য দেখানোর জন্য তাদের মাঠ পর্যায়ের ফলাফল প্রকাশ করে থাকে। কিন্তু এগুলো আসলে বাস্তব কোন প্রমাণ নয়, বরং  নির্দিষ্ট তথ্যের উপর করা সফটওয়্যারগুলোর পরীক্ষামূলক ফল। ফলে, আপনি যদি দীর্ঘমেয়াদী ভাবে ফরেক্স এ ঢুকতে চান বা আসলেই ট্রেডার হতে চান তবে এসবের দ্বারা কোন লাভ হবেনা। এগুলো বাজারের প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত অবস্থা কখনই সঠিকভাবে বুঝতে পারবেননা যার জন্য মানুষের বোধ বুদ্ধিই সবচেয়ে কার্যকর। সফটওয়্যারগুলো কিছু ব্যাপার ধরতে পারে কিন্তু এগুলোর উপর কখনই আপনার ব্যবসা নির্ভর করতে পারেনা। এজন্য automated Forex trading system পরিহার করতে হবে। এবং বাজারের স্বাভাবিক মূল্য পরিবর্তন বুঝতে শিখতে হবে ও বাজারের প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত অবস্থায় নিজেকে মানিয়ে নিতে হবে। এভাবেই দক্ষ ও সফল ট্রেডার হওয়া যাবে।

৯ম অংশ: ফরেক্সের সাধারণ ভুল-ত্রুটি ও ফাঁদ

সাধারণ ভুল ও ফাঁদ: ফরেক্স এ অনেক ভুল ও ফাঁদের যায়গা আছে যা সব ট্রেডারকেই কখনও না কখনও ঝামেলায় ফেলেছে। আসুন, ফরেক্সের কিছু অতি সাধারণ ভুলগুলো দেখা যাক যেগুলো অনাকাঙ্খিতভাবে মুনাফা কমিয়ে দেয় ও ক্ষতি করে ফেলে।

বিশ্লেষণ অক্ষমতা(Analysis Paralysis): ফরেক্সে অগণিত খবর ও প্রভাবশালী উপাদান আছে যা যে কাউকে বিভ্রান্ত করতে পারে। এছাড়া প্রচুর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ও সফটওয়্যার ও আছে যা আপনাকে বিপদেই ফেলতে পারে। এসব প্রভাব ও ব্যবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে একটা কার্যকর কিন্তু সহজ সাধারণ কৌশল বের করে তা ধরে এগোনো নতুনদের জন্য অনেক কঠিন।

একটা অন্যতম সমস্যা হল, বেশীরভাগ মানুষেরা ভাবে- যত বেশী তত ভাল। কিন্তু ফরেক্সে আসলে- যত বেশী তত খারাপ। সারাদিন কম্পিউটারে বসে অগণিত খবর ও নির্দেশক নিয়ে বিশ্লেষণ করার কোন মানে নেই। অর্থনৈতিক উপাদান ও খবরগুলো যেসব উঠানামা ডেকে আনে বাজারে তা রেখাচিত্রে সহজেই ধরা পড়ে। এর জন্য টাকা ও সময় খরচ করে বিভিন্ন সফটওয়্যার, রোবট বা খবরের বিশ্লেষণ করা একেবারেই অর্থহীন। এর ফলে তাদের বিশ্লেষণ অক্ষম হয়ে পড়ে অনেক সময়। এটা হয় যখন তারা অনেকগুলো নির্দেশক নিয়ে কাজ করতে যায় এবং গোলমাল পাকিয়ে ফেলে বোকার মতো কিছু ভুল করে বসে।

মাত্রাতিরিক্ত ট্রেড(Over trading): অনেক ট্রেডার অনেক দিন থেকেও তেমন লাভ করতে পারেনা শুধু একটা কারণে- তারা অনেক বেশী ট্রেড করে। একটা মজার ব্যাপার হল যে অনেকেই Demo Account এ অনেক ভাল করে তবে আসল বিনিয়োগের পর তারা একেবারেই যাচ্ছেতাই অবস্থায় পড়ে যায়। এর কারণ হল যখন তারা Demo হিসেবে ফরেক্স এ ট্রেড করে তখন তাদের নিজের টাকা ঝুঁকিতে পড়েনা। এর ফলে তাদের কোন আবেগও কাজ করেনা। ফলে আমরা বুঝতে পারলাম যে আবেগ হল ক্ষতির সবচেয়ে বড়  কারণ। যারা বেশী বেশী ট্রেড করে তারা আবেগ এর বশবর্তী হয়েই করে।

যখন ট্রেড এর নির্দিষ্ট কোন নিয়ম থাকেনা তখন তা মাত্রাতিরিক্ত ট্রেড হয়ে যায়। এখানে ট্রেড করার কোন বাধা-ধরা বা পরিকল্পনা তৈরি করা থাকেনা বলেই এটাকে মাত্রাতিরিক্ত ট্রেড বলে। অবশ্যই আপনি কিভাবে কি করতে চাচ্ছেন তা ঠিক করতে হবে এবং আপনার নির্দিষ্ট সীমার মধ্যেই ট্রেড করতে হবে। বেশী ট্রেড করলে লেনদেন এর খরচও বেড়ে যায় অঙ্কে বেশী আবার বাজার নিয়ে জুয়া খেলা শুরু করলে দ্রুত সব হারিয়ে যায় নিশ্চিতভাবে। মাথা ঠাণ্ডা রেখে হিসাব করে আগানো উচিৎ। জুয়া খেলার মতো ইচ্ছামত ঝুঁকি নিলে সব হারাতে হবে।

ঝুঁকি ও অর্থ ব্যবস্থাপনা ঠিকভাবে করতে না পারা:

বাজারে সফলভাবে টিকে থাকতে হলে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা খুবই জরুরি। যে কোন ট্রেডে যে লোকসানের সম্ভাবনা থাকে তা আমাদের সহ্যসীমার মধ্যে নিয়ন্ত্রণ করতে পারা হচ্ছে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা। অনেকেই এটা মানতে নারাজ যে যেকোনো ট্রেড-এ লোকসান হতে পারে। আপনি যদি স্বীকার করেন যে আপনি যে কোন ট্রেড করতে যেয়ে লোকসান করতে পারেন তবে আপনি কেন আপনি এত ঝুঁকি নিবেন যা আপনার সহ্যের বাইরে। তাও মানুষ প্রায়ই ভুল করে এবং প্রতি ট্রেডেই অনেক বেশী ঝুঁকি নিয়ে ফেলে। একটা বড় অঙ্কের লোকসান হলেই তা আমাদের আবেগপ্রবণ করে তুলে এবং আমরা পরপর অনেকগুলো ভুল করতে শুরু করি যা আমাদের কিছু বোঝার আগেই সব টাকা শেষ করে ফেলে।

কোন নির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং নিয়ম না মেনে চলা:

একটা অতি সাধারণ ভুল হচ্ছে পরিকল্পনা ছাড়াই ফরেক্স চালিয়ে যাওয়া যা অনেকেই করে থাকে। অনেকই ভাবে যে তারা কিছু টাকা উঠা শুরু হলে একটা ভাল পরিকল্পনা দাঁড় করাবে অথবা তাদের কোন বিশেষ পরিকল্পনার দরকারই নেই বা সেটা তার মাথাতেই আছে। এসব চিন্তা ভাবনা তাদেরকে সাফল্য থেকে দুরেই রাখতে পারে। আপনার যদি কোন নির্দিষ্ট পরিকল্পনা না থাকে যার মধ্যে আপনার কৌশল, লক্ষ্য ও কাজকর্ম বিস্তৃতভাবে বলা থাকবে তাহলে আপনি আবেগপ্রবন ও জুয়া খেলার মতো ট্রেড করতে থাকবেন। নতুন ট্রেডার দের একটি বিশেষ পরিকল্পনা সাজাতে হবে যা তাদের কৌশল গুলোকে ব্যবহার করে তাদেরকে কিভাবে কখন ট্রেড করতে হবে তার দিক নির্দেশনা দিবে। এটি বিস্তৃতভাবে লিখিত হতে হবে হবে যা আপনি প্রতিদিন দেখবেন ও পালন করবেন।

তাড়াহুড়া করে বিনিয়োগ করা বা বাজার নিয়ে জুয়া খেলা:

আসল টাকা নিয়ে ফরেক্সে তাড়াহুড়া করে নেমে পড়াটা প্রায় সবার জন্যই খারাপ হয়। যাইহোক, আসলে ফরেক্স এর কৌশল ও বিষয়গুলো তে সঠিকভাবে পরিপূর্ণ দক্ষতা অর্জন না করা পর্যন্ত কখনই ফরেক্স এ বিনিয়োগ করা উচিৎ না। ফরেক্স এ দক্ষতা অর্জন বলতে ডেমো হিসাবে ৩-৬ মাস ধারাবাহিক সাফল্য অর্জনকে বোঝায় যা আসল বিনিয়োগের আগে হওয়া উচিৎ। ডেমো তে কোন আবেগ কাজ করেনা বলে এটা আসল পরিবেশ হতে আলাদা এবং যখন এখানে পরিপূর্ণ সাফল্য ও দক্ষতা অর্জন করা যাবে তখনি বিনিয়োগে যাওয়া উচিৎ। একবার হাত পেকে গেলে তখন আসল টাকা নিয়ে খেলতেও ভয়ের কোন কারণ নেই।

এটা ভালভাবে মনে রাখতে হবে যে, ফরেক্স এর বাজারে নিজের টাকা নিয়ে জুয়া খেলার কোন মানে নেই। আমাদেরকে মাত্রাতিরিক্ত ট্রেড বা ঝুঁকি থেকে বিরত থাকতে হবে এবং সঠিকভাবে পরিকল্পনা ও পর্যবেক্ষণ করতে করতে হবে। নাহলে জুয়ার মতো ট্রেড করে সব হারাতে হবে। সফল ও দক্ষ ট্রেডাররা ঠাণ্ডা মাথায় পরিকল্পনা মোতাবেক হিসাব নিকাশ ও ট্রেড করে এবং নিজেদের সুনির্দিষ্ট পরিসীমায় থেকেই যা করা উচিৎ তাই জানে ও করে।

১০ম অংশ: TECHNICAL বিশ্লেষণ কি?

Technical বিশ্লেষণ: এটা হল বাজারের যেকোনো মুদ্রা-জোড় এর মূল্য পরিবর্তনের রেখাচিত্র (Price chart) পর্যবেক্ষণ করা। এটা হল একটা বিদ্যা বা কাঠামো যার সাহায্যে বাজারের মূল্য পরিবর্তন বোঝা ও তাকে কাজে লাগানো যায়।

এর সাহায্যে মূলত অতীতের মূল্য পরিবর্তনের বিশ্লেষণ করে তা থেকে মুদ্রার ভবিষ্যৎ দর অনুমান করা হয়।

বিশ্লেষকরা মনে করেন যে, যে সকল উপাদান দ্বারা বাজার নিয়ন্ত্রিত হয় তাদের সকল প্রভাব রেখাচিত্রের মাধ্যমে দেখা যায়। ফলে, আসলেই যদি সকল প্রভাব মূল্য পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রকাশ পায় তবে বাজারদর বিশ্লেষণ ছাড়া আর কোন কোন কিছু পর্যবেক্ষণ করার কোন দরকার নাই। বিশ্বের সকল Technical বিশ্লেষকরা এটা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে বাজারদর দ্বারাই বাজারে সকল উপাদানের প্রভাব প্রকাশ ও বর্ণনা করা যায়। ফলে আমাদের অন্য মাধ্যমের কি দরকার? আমরা কিছু মৌলিক বিশ্লেষণ ও খবরে চোখ রাখতে পারি আমাদের কাজের সুবিধার জন্য তবে তা খুব বেশী নির্ভরযোগ্য নয়।

বিশ্লেষকরা রেখাচিত্রে একই রকম লেখের পুনরাবৃত্তি খোঁজেন। এটা তাদের কাজে অনেক সুবিধা দেয়। এর পেছনে যুক্তি হল যে, বাজার ও তার উপাদান কোন না কোনভাবে মানুষ দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত এবং মানুষ তার চিন্তা-ভাবনা ও কাজের পুনরাবৃত্তি করে থাকে।

Technical বিশ্লেষণ শেখার মধ্যে বাজার কাঠামো বিশ্লেষণ; বাজার প্রবণতা, সহায়ক ও প্রতিবন্ধক তল, বাজারের গতির হ্রাস-বৃদ্ধি নির্ণয় অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে অবশ্যই বোধ-বুদ্ধি জড়িত আছে এবং এজন্যই একে বিজ্ঞান না বলে কলা বলা হয়। ফলে, যত বেশী সময় ও শ্রম এর পেছনে ব্যয় করা হবে তত দক্ষতা ও সাফল্য আসবে। এই পদ্ধতি আমাদের মুদ্রার দর বিশ্লেষণ করে ট্রেড করার কৌশলের মূল ভিত্তি যা সনাতন Technical বিশ্লেষণ পদ্ধতি থেকেই নেয়া এবং অত্যন্ত সোজা ও সংক্ষিপ্ত। এটা অন্যান্য ফরেক্স নির্দেশক ও পদ্ধতির মতো নয় যা বোঝা ও কাজে লাগানো দুঃসাধ্য ও জটিল।

যখন টেকনিক্যাল বিশ্লেষণের কথা বলা হয় তখন উপরের মতো একটা রেখাচিত্র প্রায় সবার চোখে ভেসে ওঠে। বাজার দরের এই রেখাচিত্র আমাদের অনেক মূল্যবান ও কার্যকর তথ্য দেয় যা বাজারের চাহিদা-যোগানের অতীত ও বর্তমানের সার্বিক চিত্র তুলে ধরে এবং বাজারমূল্যের পর্যায় প্রকাশ করে। Technical বিশ্লেষকরা এই পর্যায়গুলোকে খুবই গুরুত্ব দেন কারণ এটাই তাদের সবসময়ই কাজে দেয়। আমাদের বেশীরভাগ Technical বিশ্লেষণ রেখাচিত্রের বিভিন্ন পর্যায় থেকে বাজারের অবস্থান বুঝে ট্রেড করাকে বোঝায়। এই রেখাচিত্র বাজারের সকল লেনদেন কারীর মনোভাবকেও প্রকাশ করে।তাই, বাজারদর এর রেখাচিত্র পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ এর মাধ্যমে আমাদের ট্রেড যেমন সহজ ও সফল হবে তেমন আমরা এটা দিয়েই বাজারের সকল উপাদানের প্রভাব বুঝতে পারব।

১১তম অংশ: কিভাবে ফরেক্স এর জন্য পরিকল্পনা তৈরি করবেন?

 

পরিকল্পনা তৈরি: সফল ফরেক্স ট্রেডার হতে হলে অবশ্যই একটা পরিকল্পনা থাকতে হবে। অনেকেই কোন পরিকল্পনা করেনা ও মানেনা। কিন্তু একটা পরিকল্পনা তৈরি করা ও তা মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফরেক্স ট্রেডিং এর পরিকল্পনার কিছু প্রয়োজনীয় বিষয় নিচে আলোচনা করা হল।

পরিকল্পনা অনুসরণ, কার্যলিপি ও লেনদেনের বিবরণী রাখা: একজন সুসংগঠিত ও নিয়মানুবর্তী ট্রেডার হতে হলে তিনটি জিনিস অবশ্যই করতে হবে।

১। একটা পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে ২। একটা ট্রেডিং এর কার্যলিপি রাখতে হবে ৩। একটা লেনদেনের বিবরণী রাখতে হবে।

কার্যকর কৌশলের দ্বারা একটা পরিকল্পনা তৈরি করলে তা আপনার ফরেক্স এর কৌশল আয়ত্ত করতে এবং সবসময় কি করতে হবে তা মাথায় রাখতে কাজে দেবে। লম্বা সময় ধরে সাফল্য পেতে চাইলে যে ঠাণ্ডা মাথার ও নিয়মানুবর্তী কার্যক্রম লাগবে তার জন্য এই রূপরেখা অত্যাবশ্যকীয়।

আপনার লেনদেনের বিবরণী রাখলে একদিকে আপনার সাফল্য ও দক্ষতার প্রমাণ চোখের সামনে থাকবে আবার কখন বাজারে কেমন কেনাবেচা হয়েছে তাও জানা যাবে সহজেই। এতে আপনি চাহিদামত আপনার পরিকল্পনা সাজিয়ে ও ঠিক করে নিতে পারবেন। সাফল্য অর্জনের জন্য এটি খুবই প্রয়োজনীয় ধাপ।

কাজের সময়সূচী ও যাচাই তালিকা অবশ্যকীয়ঃ সোজা কথায়, আপনার কেনাবেচার একটা সময়সূচী থাকা আবশ্যক। নাহলে তাড়াহুড়া ও চিন্তা ভাবনার মধ্যে কখন কি হয়ে যাবে টেরই পাবেন না। ফরেক্স কোন যুদ্ধ ময়দান নয় বরং শিকারের ময়দান বলা যায়। এখানে আপনি শান্ত, সাবধান ও নিয়মানুবর্তী হতে হবে। আপনাকে শুধু সামনে যা পাবেন তাকে মারলেই চলবেনা, সহজ ও ভাল শিকারকে খুঁজে ধরে ফেলতে হবে ও কাবু করতে হবে।

আপনার একটা কাজের তালিকা থাকবে যেখানে আপনি কি খুঁজছেন, কি চাইছেন ও কি করবেন তা লিপিবদ্ধ থাকবে। আপনি সেই মতো কাজ করবেন এবং প্রতি ট্রেড এর পর তা টিক চিহ্ন দিবেন। আপনি পুরো পরিকল্পনাকে একটা সময় মাফিক কাজের তালিকায় পরিণত করতে পারেন এবং তা দেখে কাজ করে জেতে পারেন। এর ফলে কোন ঝামেলা ছাড়াই আপনি পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন করতে পারবেন।

পরিকল্পনাতে লিখিত দিকনির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় রূপরেখা দেয়া থাকবে:

পরিকল্পনাতে অবশ্যই কখন কোন অবস্থায় কি করতে হবে তা লিখিতভাবে বর্ণনা করতে হবে। এতে ট্রেড এর মাত্রা কেমন হবে, কিভাবে ট্রেড করবেন, কখন করবেন বা করবেন না, কত সময়ের জন্য করবেন, ঝুঁকি ও মুনাফার ব্যবস্থাপনা কেমন হবে এবং আপনার লক্ষ্য কি তা সব উল্লেখ থাকবে। আপনার উচিৎ কোন বাজার পরিস্থিতিতে এবং কোন পর্যায়গুলোতে ট্রেড করবেন তার চিত্রগুলো টুকে রাখা। ফলে আপনি সবসময় খেয়াল রাখতে পারবেন যে আপনার ট্রেড এর উপযোগী অবস্থা এসেছে কিনা। আপনার এই লিখিত দিকনির্দেশনা ও বাজারের আদর্শ রেখাচিত্র আপনাকে আপনার উদ্দেশ্য ও করনীয় জিনিসগুলো আপনার মাথায় ভালভাবে ঢুকিয়ে দিবে যা আপনার আত্মবিশ্বাস ও সাফল্য ত্বরান্বিত করবে।

ভবিষ্যতের ট্রেড সম্পর্কে আগে থেকেই পরিকল্পনা ও ধারনা করে রাখাই উত্তম:

লম্বা সময় ধরে সফল ও লাভজনক ফরেক্স ট্রেডার হতে হলে পরিকল্পনা থাকতেই হবে যা আপনাকে আপনার কাজের পূর্ব-পরিকল্পনা ও কি করতে চাইছেন আগে থেকেই নির্ধারণ করতে সাহায্য করবে। আপনি অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠ ও শান্ত থাকতে পারবেন এবং আপনার সবকিছুই পরিকল্পনা মাফিক অনায়াসেই করতে পারবেন। বাজারের বিভিন্ন উঠানামা ও বিভিন্ন উপাদানের নানা প্রভাব আপনাকে বিচলিত করবেনা এবং আপনি কখনই আবেগপ্রবণ হয়ে যাবেননা।

ধৈর্য ধরুন এবং সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করুন, জোর করে কিছু ঘটাবেন না:

ধৈর্য হল ফরেক্স ট্রেডার এর সবচেয়ে বড় গুণ। আপনি ধৈর্যশীল ট্রেডার হলে আপনার প্রয়োজন জানা থাকবে এবং বাজার দেখতে দেখতে যখন সঠিক সময় আসবে তখন সঠিক ট্রেডটি করবেন। এর ফলে আবেগপ্রবণ ও ধৈর্যহীন ট্রেডগুলো ও তাদের লোকসানের হাত থেকে বাঁচা যায়। ফরেক্স এর সবচেয়ে আসল কৌশল হল আদর্শ বা সঠিক অবস্থান এর জন্য অপেক্ষা করা এবং তা আসলে বুঝতে পেরে ট্রেড করা। যারা অপেক্ষা বা ধৈর্যের পক্ষপাতী না তারা সুযোগ গুলো দেখতে ও কাজে লাগাতে পারেনা এবং জুয়ার মতো ট্রেড করে সব অর্থ নিঃশেষ করে ফেলে। আপনাকে অবশ্যই ধৈর্যের গুরুত্ব বুঝতে হবে কারণ ফরেক্স এ মুনাফা ও সাফল্য পেতে হলে এটা সবচেয়ে বেশী দরকার।

১২তম অংশ: ফরেক্স এর মনস্তত্ত্ব

 

ফরেক্স এর মনস্তত্ত্ব: অনেকদিন ধরে ফরেক্স বাজারে টিকে থাকার ফলে আমরা মানুষের ফরেক্স বাজারে চিন্তাভাবনা কি থাকে তা ভালই বুঝতে পেরেছি। মোটামুটি সবাই একই রকম চিন্তা-ভাবনা, আবেগ এবং আশা নিয়ে এখানে আসে এবং কেনাবেচা করে। আমরা সফল ও ব্যর্থ ট্রেডারদের চিন্তা ভাবনার পার্থক্য থেকে অনেক কিছুই শিখতে পারি।

 

এখন যদি বলি, ফরেক্স এ সাফল্য শুধু সেরা পরিকল্পনা ও কৌশল দিয়েই আসবে তবে তা একেবারেই ভুল। এটা আমাদের মানসিকতা এবং বাজার সম্বন্ধে চিন্তা ও প্রতিক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল। অনেক প্রতিষ্ঠান ও ওয়েব সাইটে হয়ত বলবে যে নির্দেশক ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমেই সাফল্য ও মুনাফা আসবে। এটা শুধুই তাদের পণ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন করতে বলা হয়। সত্য কথা এই যে, একটি বোধগম্য ও কার্যকর কৌশল খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তা পুরো প্রক্রিয়ার একটি ছোট অংশ। বড় অংশ হল আমাদের ট্রেড এবং আবেগকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। এটা না করলে ফরেক্স এ মুনাফা অর্জন করা বা টিকে থাকা অসম্ভব।

বেশীরভাগ ট্রেডার কেন লোকসান করে?

অনেকেই শোনা যায় ফরেক্স এ এসে শুধু টাকা-পয়সা হারিয়েছে। এর পেছনে খুব ভাল যুক্তি আছে এবং তা হল মূলত ফরেক্স ও ট্রেড সম্পর্কে ভুল দিক থেকে চিন্তা করা। বেশীরভাগ লোক আকাশ কুসুম কল্পনা নিয়ে ফরেক্স এ আসে যে তাদেরকে আর চাকুরী করতে হবেনা বা তারা অল্প সময়ে তাদের টাকা চারগুণ বা দশগুণ করে ফেলবে। এই অবাস্তব প্রত্যাশা আমাদের মানসিকতা কে আত্ম-বিধ্বংসী করে তোলে কারণ আমরা ফরেক্স থেকে অর্থ লাভের জন্য অসম্ভব চাপ বা প্রয়োজন অনুভব করি। এই চাপ বা প্রয়োজন আমাদেরকে আবেগপ্রবণ হতে বাধ্য করে এবং এটাই আমাদের সর্বনাশ করে ছাড়ে।

ট্রেড করার সময় কোন আবেগ-অনুভূতিগুলো কে নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিৎ?

আবেগপ্রবণ হয়ে ট্রেড করা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে আমরা এখন আবেগজনিত ভুল-ত্রুটি গুলো সম্পর্কে জানব।

লোভ: ফরেক্স বাজারে একটা ইংরেজি প্রবাদ আছে- “Bulls make money, bears make money and pigs get slaughtered.” এর মানে হল বাজারে উঠানামা যায় হক না কেন তা থেকে লাভ হবে কিন্তু শুধু লোভ করলেই সর্বনাশ হবে। লোভীরা বেশী মুনাফার আশায় থাকে এবং ভাবে ও আশা করে যে বাজার সবসময় তাদের চিন্তামতই চলবে। এর ফলে ট্রেড থেকে সময়মত মুনাফা তুলে না নিয়ে আরও লাভের আশায় থাকে। আরেকটি কাজ তারা করে যে বাজার তাদের আশামত একটু এগোলেই সেইদিকে আরও কেনাবেচা করতে থাকে। বাজারদর বিশ্লেষণ করে সঠিক মনে হলে আপনি একদিকে কেনাবেচা বাড়াতে পারেন। কিন্তু আপনার আশামত বাজারদর একটু যাচ্ছে দেখেই সেদিকে লাভ করার চেষ্টা খুবই লোভী স্বভাবের কাজ। যে কোন ট্রেড এ খুব বেশী পরিমাণে অর্থ বিনিয়োগও লোভের শামিল। মোদ্দা কথা হচ্ছে যে, আমরা যাই করি না কেন তা লোভের বশবর্তী না হয়ে আমাদের পরিকল্পনা ও বুদ্ধি খাটিয়ে করতে হবে। একটু বেশী লাভের আশাতে নাহলে আমাদের অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে।

ভয়: যারা নতুন অথবা জাদের কোন কার্যকর কৌশল জানা নেই তারা প্রায়ই ট্রেড করতে ভয় পায়। পরপর কিছু লোকসান হলে বা বড় কোন লোকসান হলে যা মানসিকভাবে মেনে নিতে পারছেনা এমন বড় কোন লোকসান হলেও ভয় চলে আসে। এই ভয় কাটাতে হলে প্রথমত যে পরিমাণ লোকসান মানসিকভাবে সহ্য করতে পারব সেই পরিমাণ অর্থেরই শুধু ট্রেড করা উচিৎ। আপনি যদি আপনার অর্থ হারানো মেনে নিতে পারেন তবে ঝুঁকি নিতে আর কোন ভয় থাকল না। ভয়ের ফলে অনেক লাভ থেকে বঞ্চিত হতে হ কারণ এটা আমাদের কেনাবেচা সীমিত করে ফেলে।

প্রতিশোধ: নিশ্চিত মুনাফা হবে এমন কোন লেনদেন থেকে যদি শেষে লোকসান হয় তবে ট্রেডারদের মনে প্রতিশোধের আগুন জলে উঠে। আসলে নিশ্চিতভাবে কখনই কিছু হয়না- এই কথাটাই শুধু নিশ্চিতভাবে বলা যায়। আবার কেউ যদি বেশী অর্থ কোন ট্রেড-এ লাগায় এবং লোকসান হয় তবে সেই টাকা তোলার জন্য আবার বেশী পরিমাণ অর্থের ট্রেড করে। এটা একেবারেই আবেগপ্রবণ একটা সিদ্ধান্ত যার পরিণাম বেশীরভাগ ক্ষতিই হয়।

রমরমাভাবঃ রমরমা ভাব চললে ভালই। তবে একটা বড় লাভ হলে বা পরস্পর কয়েকটি লাভজনক ট্রেড চললে অনেক সময় তা আমাদের জন্য ক্ষতি ডেকে আনে। বড় কোন মুনাফা অর্জন করলে ট্রেডাররা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠে এবং এর ফলে তার পরই বিশাল কোন লোকসানের মুখে পড়ে। বাজার আশা অনুযায়ী চললে বা কিছু লাভজনক ট্রেড হলে কেউই আরও বেশী ট্রেড করা থেকে বিরত থাকতে পারেনা। তারা মনে করে যে তারা যা করবে তাতেই লাভ হবে। কিন্তু আমাদের সবসময় আমাদের নিজেদের ও বাস্তবতার কথা মাথায় রাখতে হবে।

অনেকেই কয়েকটা লাভজনক ট্রেড করার পর আবেগপ্রবণ হয়ে ট্রেড করা শুরু করে এবং টাকা হারাতে থাকে। এর কারণ হল তাদের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ও রমরমা মনোভাব যা তাদের ভুলিয়ে দেয় সবচেয়ে বড় বিপদসংকেত – যে কোন ট্রেড-এই লোকসান হতে পারে। যে মূল কথাটা মনে রাখতে হবে তা হল- ফরেক্স হল সম্ভাব্যতার দীর্ঘ-মেয়াদী খেলা। বাজারের গতি যদি উচ্চ-সম্ভাবনাময় তবে দীর্ঘ-মেয়াদী পর্যায়ে অবশ্যই মুনাফা হবে সেই মোতাবেক ঠিকভাবে কাজ করলে। বাজার যদি ৭০ শতাংশ হারেও সম্ভব্য সীমায় চলে তাহলেও এটা হতে পারে যে আপনার ১০০ টি ট্রেড এর মধ্যে পরস্পর ৩০ টি ট্রেড এ ক্ষতি হবে। ফলে এটা মাথায় সবসময় রাখতে হবে যে কোন ট্রেড এ লাভ হবে আর কোন ট্রেড এ লোকসান হবে তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেনা।

কিভাবে ট্রেডিং এর জন্য কার্যকর মানসিকতা তৈরি করবেন ও তা বজায় রাখবেন?

কার্যকর মানসিকতা অর্জন করতে ও বজায় রাখতে অনেক কাজ সঠিকভাবে করতে হয়। এর জন্য অনেক সচেতনভাবে ও মনোযোগ দিয়ে চেষ্টা করতে হবে। এটা খুব বেশী কঠিন কিছু না। তবে আপনাকে কার্যকর মানসিকতা গড়ে তুলতে হলে ফরেক্স, বাজার ও ট্রেড সম্পর্কে কিছু কথা মানতে হবে এবং তা সবসময় মাথায় রাখতে হবে।

আপনি কোন কৌশল অবলম্বন করতে চান তা ঠিক করতে হবে এবং তা ভালভাবে রপ্ত করতে হবে। এলোপাথাড়ি ট্রেড না করে আপনাকে দক্ষ শিকারির মতো কৌশল ও ধৈর্যের সাথে চলতে হবে। কোন অবস্থায় কি করতে চান এবং প্রতি ট্রেড এ কি পরিমাণ অর্থ ঝুঁকি নিতে চান সেগুলো নিয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত থাকতে হবে।

ঝুঁকি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে সবসময়। আপনি যদি প্রত্যেকটি ট্রেড এর ঝুঁকির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারেন তবে আপনার ট্রেডগুলো আবেগের বশবর্তী হয়ে পরবে। আপনি আবেগপ্রবণ ট্রেড এর গর্তে পড়ে যেতে থাকবেন এবং তা হয়ত বুঝতেও পারবেন না। আবেগের বশবর্তী না হতে চাইলে সবচেয়ে ভাল বুদ্ধি হল আমরা প্রতি ট্রেড-এ সেই পরিমাণ অর্থ লাগাবো যা হারালে আমাদের মেনে নেয়ার ক্ষমতা আছে। এটা সবসময় মাথায় রাখতে হবে যে চলমান যে কোন ট্রেড এ লোকসান হয়ে যেতেই পারে, কারণ লোকসান অবশ্যম্ভাবী।

কখনও অতিরিক্ত ট্রেড করা উচিৎ নয়। অনেকেই প্রচুর পরিমাণে কেনাবেচা করেন। আপনাকে নিশ্চিত হতে হবে যে আপনার সীমা কতটুকু এবং সেই সীমার মধ্যে বাজার গতিশীল হলেই ট্রেড করা উচিৎ। বাজার ভাল মনে হচ্ছে বা এখন ট্রেড করলে লাভ হবে মনে হচ্ছে- এইসব চিন্তা আমাদের আবেগপ্রবণ ট্রেড এর দিকে ঠেলে দেয় যা থেকে রক্ষা পাওয়া কঠিন। অতিরিক্ত ট্রেড আমাদের সর্বনাশা আবেগপ্রবণ ট্রেডার করে ফেলে।

আপনাকে সুসংগঠিত হতে হবে। আমরা যতকিছুর কথা এতক্ষণ বললাম সেগুলো একত্র ভাবে ঠিকঠাক ভাবে করতে আপনার নিজের মধ্যে সংগঠিত হতে হবে। আপনার ট্রেডিং এর জন্য সঠিক পরিকল্পনা ও বিবরণী রাখতে হবে। এটা একটা ব্যবসা, কোন বাজি বা জুয়ার আড্ডা না- এটা সর্বদা মাথায় রাখতে হবে। ঠাণ্ডা মাথায় সব কিছু হিসাব করে করতে হবে তাহলেই কখনও আবেগ এর বশবর্তী হয়ে নিজের সর্বনাশ নিজে করবেন না।

সংক্ষেপে আবারও উপরে বর্ণিত কোর্সের শিরোনামসমূহ কোন বিষয় মিস করেছেন কি? করলে আবার পড়ুন

  • ১ম অংশ: ফরেক্স সম্পর্কে মৌলিক ধারনা
  • ২য় অংশ: ফরেক্স এর পরিভাষা (Forex terminology)
  • ৩য় অংশ: লেনদেন এর প্রকার, লাভ-লোকসান এর হিসাব
  • চতুর্থ অংশ: পেশাদার ফরেক্স ট্রেডিং(Professional Forex Trading):
  • ৫ম অংশ: মৌলিক বিশ্লেষণ (Fundamental Analysis)
  • ৫ম অংশ: মৌলিক বিশ্লেষণ (Fundamental Analysis)
  • ৬ষ্ঠ অংশ: Price Action Trading Analysis কি?
  • ৭ম অংশ: পরিচিত হউন ফরেক্স এর Price Chart সাথে।
  • ৮ম অংশ: ফরেক্স ট্রেডিং এর কৌশল কি?
  • ৯ম অংশ: ফরেক্সের সাধারণ ভুল-ত্রুটি ও ফাঁদ
  • ১০ম অংশ: TECHNICAL বিশ্লেষণ কি?
  • ১১তম অংশ: কিভাবে ফরেক্স এর জন্য পরিকল্পনা তৈরি করবেন?
  • ১২তম অংশ: ফরেক্স এর মনস্তত্ত্ব